ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত

রণক্ষেত্র থেকে আলোচনার টেবিলে ট্রাম্পের ‘দ্রুত সমাধান’ তত্ত্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছিল, তা কি এবার কাটার পথে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং তেহরানের কূটনৈতিক তৎপরতা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের ওভাল অফিস থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আভাস দিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে চলমান এই ভয়াবহ সংঘাত ‘খুব দ্রুত’ একটি সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। 

তবে এই শান্তির পথ কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে এখনো সংশয় কাটছে না। কারণ, একদিকে যখন হোয়াইট হাউস একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার দাবি করছে, অন্যদিকে ইরানের ভেতর থেকে ধেয়ে আসছে তীব্র সমালোচনার সুর।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই প্রথাগত কূটনীতির চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব এবং সরাসরি চুক্তিতে বিশ্বাসী। ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতের শুরু থেকেই তিনি ‘পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলা’র মতো কঠোর হুমকির পাশাপাশি আলোচনার প্রস্তাবও দিয়ে আসছিলেন। গত কয়েক দিনের ঘটনাক্রমে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প এখন যুদ্ধের চেয়ে একটি ‘চৌকস চুক্তির’ দিকেই বেশি আগ্রহী।

ট্রাম্প সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেন, ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি খুব কাছে। আমরা তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বন্ধ করতে চাই এবং অধিকাংশ শান্তিকামী মানুষ আমার এই লক্ষ্যের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন। 

হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন একটি ১৪ দফার খসড়া তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানোর একটি দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে। ট্রাম্পের ভাষায়, সব কার্ড এখন আমার হাতে,যা দিয়ে তিনি ইরানকে আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে বাধ্য করছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরান একটি সমঝোতা স্মারকের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই সমঝোতা কার্যকর হলে তা হবে গত কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অর্জন। তবে তেহরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। তারা বলছে, প্রস্তাবটি বর্তমানে পর্যালোচনার টেবিলে রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি চীন, পাকিস্তান, ওমান এবং রাশিয়া সফর করেছেন। এই সফরগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মিত্রদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তি নিয়ে পরামর্শ করা। ইরান সরকার কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখলেও দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই প্রস্তাব নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

হোয়াইট হাউস যখন সমঝোতার সুবাতাস ছড়াচ্ছে, ঠিক তখন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইবরাহিম রেজায়ি এই প্রস্তাবকে স্রেফ ‘একতরফা দাবিদাওয়ার তালিকা’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত কয়েক মাসের সামরিক অভিযানে যা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তা এখন আলোচনার টেবিলে প্রতারণার মাধ্যমে আদায়ের চেষ্টা করছে।

রেজায়ি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ইরান কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। আমাদের সেনারা যেকোনো সময় পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত।এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, তেহরানের ভেতরে কট্টরপন্থী এবং আইআরজিসি (ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর) অংশটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা রাখতে পারছে না।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে এক ফোনালাপে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, ইরান কূটনৈতিক পথে যুদ্ধ বন্ধ করতে প্রস্তুত, তবে তা অবশ্যই ‘ন্যায়সঙ্গত এবং পূর্ণাঙ্গ’ হতে হবে। পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন যে, যখন পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে দুবার হামলা চালিয়েছে। তিনি এই আচরণকে ‘পেছন থেকে ছুরি মারা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান আরও মনে করিয়ে দেন যে, ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করার প্রশ্নই আসে না। তার এই অবস্থানে এটি স্পষ্ট যে, আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে হামলার হুমকি ও অবরোধের পথে পরিবর্তন আনতে হবে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক দিনে এই এলাকায় বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজে বিস্ফোরণ এবং আমিরাতের ফুজাইরা পেট্রোলিয়াম স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে এক বিশেষ অভিযান শুরু করেছে যার লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালিকে ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা। অন্যদিকে ইরান হুমকি দিয়েছে যে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো মার্কিন জাহাজ এখান দিয়ে পার হতে পারবে না। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনার আভাসের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমলেও হরমুজে মাইন আতঙ্ক এখনো কাটেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রণালি মাইনমুক্ত করে সম্পূর্ণ সচল করতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার সম্ভাবনা দেখা দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের আরেক শক্তি ইসরায়েল কঠোর অবস্থানে অটল রয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং তেহরানে আবার হামলা চালানোর জন্য ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে। নেতানিয়াহু সরকার মনে করে, ইরান আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ নিচ্ছে।

ট্রাম্পের ‘এক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তি’ করার দাবি এবং ইরানের ‘প্রস্তাব বিবেচনা’ করার বিষয়টি বিশ্ববাসীকে কিছুটা আশ্বস্ত করলেও প্রকৃত শান্তি এখনো বহুদূর। ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার সংকট অত্যন্ত গভীর। ২০২৫-২৬ সালের এই সংক্ষিপ্ত সংঘাত ইতিমধ্যে কয়েকশ বেসামরিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এটি একটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তিনি কি পারবেন তার দ্বিতীয় মেয়াদে বড় কোনো যুদ্ধ ছাড়াই ইরানের সঙ্গে একটি ‘ডিল’ সম্পন্ন করতে? নাকি এই ১৪ দফার প্রস্তাব কেবল একটি আল্টিমেটাম হিসেবে কাজ করবে যা ব্যর্থ হলে আরও বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা হবে?

আগামী ১৪ মে ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধিদের পাকিস্তান সফর এবং ইরানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র শান্ত থাকবে নাকি বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠবে।

বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। যুদ্ধ যদি সত্যিই দ্রুত শেষ হয়, তবে তা হবে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির এক ঐতিহাসিক বাঁকবদল।

এএন