‘গ্রেটার ইসরাইল’ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সেই বিতর্কিত ও ভয়ংকর পরিকল্পনা কি তবে আলোর মুখ দেখছে? যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে মুছে ফেলে সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও মিসরের অংশবিশেষ দখলের মাধ্যমে কায়েম হবে জায়নবাদী শাসন। ইরান যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরাইলি বাহিনীর বর্তমান থাবা সেই আশঙ্কাই জোরালো করছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ১ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, যা দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। গাজার মতোই এখানে চালানো হচ্ছে নির্বিচার ধ্বংসলীলা। প্রাণভয়ে বাসিন্দারা এলাকা ছেড়েছেন অথবা নিহত হয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাজা মডেলের আদলে দক্ষিণ লেবাননেও স্থায়ী বসতি গড়তে পারে ইসরাইল, যা তথাকথিত ৩০০০ বছর আগের ‘প্রমিস ল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার পথে বড় পদক্ষেপ।
ইসরাইলের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূলে রয়েছে ‘গ্রেটার ইসরাইল’ বা ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ মতবাদ। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাইবেলে বর্ণিত “মিসরের নদী থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত” বিস্তৃত ভূখণ্ডের মধ্যে পুরো লেবাননই এই আদর্শিক মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি এই বৈশ্বিক সন্দেহকে আরও উসকে দিচ্ছে।
মার্চ মাসে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের শুরুতে ইসরাইল একে শুধু ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করার’ লক্ষ্য বলে প্রচার করেছিল। কিন্তু সময়ের সাথে পরিস্থিতি বদলেছে। লিতানি নদী পর্যন্ত তথাকথিত “নিরাপত্তা বাফার জোন” তৈরির আড়ালে দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি দখলের পরিকল্পনা এখন স্পষ্ট। নেতানিয়াহুর আদর্শিক চিন্তা এখন ইসরাইলি রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে, যার প্রতিফলন ঘটছে লড়াকু এই অভিযানে।
গাজার মতোই দক্ষিণ লেবাননের সাধারণ মুসলিমরা এই যুদ্ধের বড় শিকার। ১০ এপ্রিলের এক ভয়াবহ হামলায় একদিনেই ৩০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত লেবাননে নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজারের বেশি মানুষ। প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক সংকটে পড়েছেন।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৮২ সালের “অপারেশন পিস ফর গ্যালিলি”-র লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক; অর্থাৎ বৈরুতে একটি ইসরাইলপন্থি সরকার বসানো। কিন্তু ২০২৬ সালের এই আগ্রাসন পুরোপুরি ‘ভৌগোলিক ও ভৌত আধিপত্য’ বিস্তারের লড়াই। ইসরাইল এখন কোনো স্থানীয় মিত্র খুঁজছে না, বরং গাজা মডেল অনুযায়ী পদ্ধতিগতভাবে অবকাঠামো ধ্বংস করে এলাকাটি স্থায়ীভাবে জনশূন্য করছে। হারমোন পর্বত ও নাবাতিয়েহ অঞ্চলে তারা এখন স্থায়ী সেনা অবকাঠামো নির্মাণ করছে।
বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ ৪৩ হাজার সেনার বিশাল বাহিনী নিয়ে ইসরাইল একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালাচ্ছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ইসরাইলের নতুন আন্তর্জাতিক সীমানা হওয়া উচিত লিতানি নদী পর্যন্ত। তার মতে, এটি একটি “নতুন বাস্তবতা” যা বিশ্বকে মেনে নিতে হবে। জায়নবাদীদের কাছে এই নদী কেবল সামরিক সীমানা নয়, বরং একটি ধর্মীয় সীমানা।
সিরিয়ায় আসাদ শাসনের পতন এবং সেখানে তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতাকে কাজে লাগাচ্ছে ইসরাইল। অন্যদিকে লেবানন বর্তমানে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে। ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপ এবং সংসদীয় নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় বৈরুতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। এই সুযোগে ইসরাইল দক্ষিণে কার্যত সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হচ্ছে কারণ ইসরাইল এমন সব শর্ত দিচ্ছে যা লেবাননের সার্বভৌমত্বকে (যেমন বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের নিয়ন্ত্রণ) সরাসরি আঘাত করে। ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য প্রশাসনের সমর্থনের আশায় ইসরাইল তাদের দখলদারিকে স্থায়ী রূপ দিতে চাইছে। লিতানি নদী এখন কেবল একটি ভৌগোলিক নাম নয়, বরং লেবাননের সার্বভৌমত্ব পতনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মানচিত্র বদলের এই দাগ হয়তো আগামী প্রজন্মকেও বয়ে বেড়াতে হবে।
জেএইচআর