‘যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অস্বীকৃতি ইরানের জন্য মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ৮, ২০২৬, ০৭:২৯ এএম
ইরানের জাতীয় পতাকা

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এক নতুন মোড় নিয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলা এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়টি অস্বীকার করার ঘটনাটি তেহরানের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট’-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক 'ত্রিতা পার্সি'আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ করেছেন।

ত্রিতা পার্সির মতে, ইরান এই পুরো বিষয়টিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখছে না। বরং ইরানিরা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি ধারা তৈরি করতে চাইছে যা অনেকটা ইসরায়েলের অনুসৃত নীতির মতো। 

ইসরায়েল যেমন গাজা, পশ্চিম তীর এবং লেবাননে এক ধরণের ‘একতরফা যুদ্ধবিরতি’ (Unilateral Ceasefire) চাপিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্রও উপসাগরীয় অঞ্চলে সেই একই মডেল কার্যকর করার চেষ্টা করছে বলে তেহরান সন্দেহ করছে।

পার্সি ব্যাখ্যা করেন যে, এই দ্বিমুখী নীতি ইরানের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। কারণ এটি তাদের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।

পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক সংঘাতের সূত্রপাত কে করেছে, সে বিষয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। পার্সি উল্লেখ করেন যে, ঘটনার বিবরণে বেশ কিছু বৈপরীত্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে তারা আত্মরক্ষার্থে বা কোনো উস্কানির জবাবে হামলা করেছে, অন্যদিকে ইরানের দাবি অনুযায়ী এটি একটি প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

পার্সি বলেন, এই পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হতে পারে; ইরানিরা আগে গুলি চালিয়েছে কি না, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী গল্প রয়েছে।” তবে মূল সমস্যাটি কেবল প্রথম গুলির ওপর নির্ভর করছে না, বরং তার পরবর্তী আইনি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করছে।

ত্রিতা পার্সির বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘পারস্পরিকতা’। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, যদি একই কাজ ইরান করত এবং বলত যে এটি কোনো যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন নয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই তা মেনে নিত না। 

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যা করছে তা করার পর যদি বলে এটি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন নয়, তবে সেটি ইরানের জন্য গ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন। ঠিক একইভাবে, ইরান যদি এমন কিছু করত এবং আমেরিকানদের একই কথা বলত, তবে আমেরিকানরাও তা মেনে নিত না।

এই বক্তব্যটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় সত্যকে সামনে নিয়ে আসে—তা হলো শক্তিশালী দেশগুলো প্রায়শই নিয়মকানুনকে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে, যা অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির জন্য মেনে নেওয়া অবমাননাকর হয়ে দাঁড়ায়।

এত কিছুর পরেও, একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়: পরিস্থিতি কি আরও খারাপের দিকে যাবে, নাকি উভয় পক্ষ আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে?

পার্সির মতে, যুদ্ধবিরতিতে ফিরে যাওয়ার এবং উত্তেজনা আর না বাড়ানোর একটি সূক্ষ্ম সম্ভাবনা এখনো টিকে আছে। এর প্রধান কারণ হলো স্বয়ংক্রিয় স্বার্থ। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান—উভয় দেশই সম্ভবত জানে যে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ কারোর জন্যই সুফল বয়ে আনবে না। তিনি তার আলোচনার ইতি টেনে বলেন, 'উভয় পক্ষই সম্ভবত এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে আগ্রহী যে, পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখা বর্তমানে একটি সুতোর ওপর ঝুলে আছে। গাজা বা লেবাননের মতো পরিস্থিতি যদি উপসাগরীয় অঞ্চলেও তৈরি হয়, তবে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ত্রিতা পার্সির এই বিশ্লেষণটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেই হয় না, তার শর্তগুলো উভয় পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হয়।

যদি যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করে এবং একই সাথে দাবি করে যে তারা শান্তি বজায় রাখছে, তবে ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিগুলোর কাছে সেই ‘শান্তি’র সংজ্ঞা হবে প্রশ্নবিদ্ধ। বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈকি তৎপরতাই পারে কোনো বড় ধরনের সামরিক বিপর্যয় এড়াতে, যেখানে উভয় পক্ষকেই একে অপরের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মূলসূত্র: আল জাজিরা

এএন