ইরান সংকট সমাধানে শি জিনপিংয়ের সহায়তা চাইলেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ১৪, ২০২৬, ১২:২১ পিএম

ইরান সংকট সমাধানে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সময় এমন একটি কৌশলগত ইস্যুও আলোচনায় এসেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের দীর্ঘ তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

চীন সফরে থাকা ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকে মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে ছিল দুই দেশের বাণিজ্য, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্ভাব্য বিরোধ। তবে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আলোচনায় আলাদা গুরুত্ব পায়। মার্কিন প্রশাসনের একাংশ মনে করছে, বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে ইরানের ওপর চাপ তৈরিতে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সহযোগিতা একতরফা হবে না। বেইজিং যদি ওয়াশিংটনের অনুরোধে সাড়া দেয়, তাহলে বিনিময়ে তাইওয়ানসহ অন্যান্য ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এবারের শীর্ষ বৈঠকে ইরান ইস্যু মূল আলোচ্যসূচির কেন্দ্রবিন্দু নয়।

বউডুইন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও এশিয়া স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার হারলিনের মতে, ইরান প্রশ্নটি আলোচনায় থাকলেও এটি কোনো পক্ষের জন্যই প্রধান অগ্রাধিকার নয়। তিনি মনে করেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে বৈঠক পিছিয়ে গেলেও চীনের দৃষ্টি মূলত তাইওয়ান ইস্যুর দিকেই বেশি কেন্দ্রীভূত থাকবে। অন্যদিকে ট্রাম্প চীনের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে মার্কিন কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সয়াবিন ক্রয়ের বিষয়টি সামনে আনতে পারেন।

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইরানি তেল আমদানিকারক দেশ। ফলে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বা সম্ভাব্য অবরোধের পরিস্থিতি বেইজিংয়ের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। যদিও এ সংকটে সরাসরি হস্তক্ষেপে চীন এখনো সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। হারলিন বলেন, বেইজিং নিজেদের এমন একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে, যারা ইচ্ছা করলে ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু এখনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না। সম্প্রতি তারা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও আতিথ্য দিয়েছে, যা কূটনৈতিক সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প কিছুটা চাপের মধ্যেই বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। ইরান সংকটের কারণে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য চীনের সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি চীনের হাতে কৌশলগত সুবিধাও তৈরি করে দিতে পারে, বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে।

লন্ডনের এক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মনে করেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীনের সহায়তা প্রয়োজন হলেও সেটি ওয়াশিংটনের জন্য কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এতে বেইজিং আরও বেশি প্রভাবশালী অবস্থানে চলে যেতে পারে।

চীনের অর্থনীতির বড় অংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে সরাসরি প্রভাব পড়বে তাদের শিল্প ও বাণিজ্যে। যদিও ইরান সংকটের কারণে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তবু বেইজিং এখনো সংঘাতে সরাসরি জড়ানোর বদলে কূটনৈতিক অবস্থানেই থাকতে চায়।

অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা হওয়ায় তাদের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তেহরানকে আলোচনায় আনা সম্ভব হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রীও সম্প্রতি বেইজিংকে এ সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

তবে চীনা কূটনৈতিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ। তারা প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও সরাসরি চাপ প্রয়োগে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। বরং বেইজিংয়ের কৌশল হলো সংযম, বহুপক্ষীয় সংলাপ এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা।

ইরানও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না হলে সরাসরি আলোচনায় বসা কঠিন হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ বজায় রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপও অব্যাহত রেখেছে।

চীনের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বেইজিং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে কূটনৈতিকভাবে সমর্থন জানালেও একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল চায়। এই অবস্থান অনেক সময় ইরানের সার্বভৌম দাবির সঙ্গে কিছুটা বিরোধ সৃষ্টি করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিযোগিতা ও বিরোধে আবদ্ধ। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, দক্ষিণ চীন সাগর এবং তাইওয়ান ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্ক আরও জটিল হয়েছে কোভিড-১৯, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির কারণে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈঠকে ইরান ইস্যু এককভাবে বড় বিষয় না হলেও এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি, তেল সরবরাহ এবং তাইওয়ান ইস্যু একে অপরের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।

চূড়ান্তভাবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র চীনের সহযোগিতা চায়, তাহলে তার বিনিময়ে বেইজিংও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দাবি সামনে আনতে পারে। আর সেখানেই এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক হিসাব–নিকাশ লুকিয়ে রয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

এএন