পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দেড় দশকের তৃণমূল শাসনের অবসানের পর বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেই তাদের তুরুপের তাস চালতে শুরু করেছে। শপথ গ্রহণের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় রাজ্যজুড়ে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করে নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে নবান্ন।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে গরু, মহিষ ও ষাঁড়সহ সব ধরনের পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি শংসাপত্র বা ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি জবাইযোগ্য পশুর বয়স কমপক্ষে ১৪ বছরের বেশি হতে হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে কার্যত পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশ্যে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে পশু জবাই এক প্রকার নিষিদ্ধ হয়ে পড়ল।
বিজ্ঞপ্তির মূল বার্তা: সনদ ছাড়া জবাই অসম্ভব
নতুন এই নির্দেশনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘জবাইযোগ্যতা’র প্রমাণ। এখন থেকে কোনো পশু জবাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারি পশু চিকিৎসকের কাছ থেকে একটি যৌথ শংসাপত্র নিতে হবে। এই নিয়মটি কেবল গরু বা মহিষ নয়, বরং জবাইযোগ্য সব পশুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সনদ ছাড়া কোনো পশু জবাই করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
পশুর বয়স ও সক্ষমতা নিয়ে কঠোর শর্ত
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই নতুন বিজ্ঞপ্তিতে পশু জবাইয়ের জন্য এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। শর্তগুলো হলো:
বয়সসীমা: জবাইযোগ্য পশুর বয়স কমপক্ষে ১৪ বছরের বেশি হতে হবে।
উপযোগিতা হারানো: পশুটিকে প্রজনন বা কৃষিকাজের মতো শ্রমসাধ্য কাজের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী হতে হবে।
শারীরিক অবস্থা: যদি কোনো পশু বয়স, গুরুতর আঘাত, বিকলাঙ্গতা বা কোনো অনিরাময়যোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে, কেবলমাত্র তখনই তা জবাইয়ের অনুমতি পেতে পারে।
এই শর্তগুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং সরকারি পশু চিকিৎসককে। তাঁদের যৌথ স্বাক্ষরিত সনদ পেলেই কেবল পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
নির্দিষ্ট স্থান ও জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা
নতুন সরকারের এই আদেশ অনুযায়ী, পশু জবাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট কসাইখানা বা মিউনিসিপ্যালিটি নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোথাও জবাই করা যাবে না। বিশেষ করে জনসমক্ষে, খোলা জায়গায় বা কোনো ধর্মীয় উৎসবের সময়ও যত্রতত্র পশু জবাই করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জনস্বাস্থ্য এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়েই এই ‘নির্ধারিত স্থান’ নীতি কার্যকর করা হচ্ছে।
শাস্তির বিধান ও আপিল প্রক্রিয়া
বিজেপি সরকার এই নিয়ম কার্যকরে কোনো আপস করতে রাজি নয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে:
কারাদণ্ড ও জরিমানা: নিয়ম ভঙ্গ করে সনদ ছাড়া বা খোলা জায়গায় পশু জবাই করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা ১ হাজার রুপি জরিমান (বা উভয় দণ্ড) হতে পারে।
পরিদর্শন ক্ষমতা: মিউনিসিপ্যালিটি বা পঞ্চায়েতের অনুমোদিত কর্মকর্তারা যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে বা কসাইখানায় তল্লাশি চালাতে পারবেন। এই কাজে বাধা দিলে তা সরকারি কাজে বাধা হিসেবে গণ্য হবে এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আপিল করার সুযোগ: যদি কোনো ব্যক্তি মনে করেন যে তাঁর পশুকে সনদ দিতে অন্যায্যভাবে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে, তবে তিনি ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের নির্ধারিত উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন।
মমতার শাসনের অবসান ও বিজেপির ‘হিন্দুত্ব’ এজেন্ডা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের এই পদক্ষেপটি আদতে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিরই অংশ। দীর্ঘকাল ধরেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে গোহত্যা এবং অবাধে পশু জবাই নিয়ে সোচ্চার ছিল। ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরই এই ধরনের প্রশাসনিক নির্দেশ জারির মাধ্যমে তারা তাদের মূল ভোটারদের কাছে বার্তা দিতে চাচ্ছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং খাদ্যাভ্যাসের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা মাংস শিল্পের সাথে সরাসরি যুক্ত এবং প্রান্তিক খামারিরা এই ১৪ বছরের বয়সসীমা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
জনমনে প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিজ্ঞপ্তি জারির পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘পশু সুরক্ষা’ এবং ‘বিজ্ঞানসম্মত জবাই পদ্ধতি’ বলা হলেও, বিরোধীরা একে ‘মেরুকরণের রাজনীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এদিকে রাজ্য পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে এই নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের মে মাসের এই উত্তপ্ত আবহে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের এই পদক্ষেপটি রাজ্যের আর্থ-সামাজিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চলেছে। ১৪ বছরের বয়সসীমা এবং সরকারি চিকিৎসকের কঠোর সনদ নীতি- এই দুই বেড়াজালে পশু জবাইয়ের বিষয়টি এখন পুরোপুরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে। এই নতুন আইনি কাঠামো পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মীয় রীতিনীতিতে কতটুকু প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সূত্র: এনডিটিভি
এএন