ভারতের মেহসানা জেলার একটি সরকারি হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে এক যুবক আত্মহত্যা করার পর বেরিয়ে এসেছে এক লোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের কাহিনী। গত ৪ মে ঘটা এই আত্মহত্যার ঘটনার পর পুলিশ নিহতের পকেট থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করে। সেই চিঠিতেই মৃত যুবক স্বীকার করে গেছেন যে, তিনি তাঁর স্ত্রী ও দুই বছরের কন্যাসন্তানকে হত্যা করে ঘরেই পুঁতে রেখেছেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যাকারী যুবকের নাম গিরিশ (৩০)। তাঁর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা (২৯) এবং নিহত মেয়ের নাম পরী। গিরিশ চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, প্রায় সাত মাস আগে তিনি তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করেন এবং মরদেহের অবস্থানও সুনির্দিষ্টভাবে লিখে যান।
চিঠির সূত্র ধরে পরদিন পুলিশ একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। প্রায় দুই ঘণ্টার তল্লাশি শেষে ঘরের ভেতরের নির্দিষ্ট স্থানের মাটি খুঁড়ে মা ও মেয়ের মরদেহের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যার পর গিরিশ তাদের লাশ প্রায় চার ফুট গভীরে মাটিচাপা দিয়ে ওপরে সিমেন্টের প্লাস্টার করে দেন। শুধু তাই নয়, যেখানে লাশ পুঁতে রাখা হয়েছিল, তাঁর পাশেই অপর যমজ মেয়ে চাহাতকে নিয়ে গত সাত মাস ধরে বসবাস এবং নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া করতেন তিনি।
প্রেমের বিয়েতে পরিবারের আপত্তি ও আর্থিক সংকট: পুলিশ জানায়, চার বছর আগে সহপাঠী প্রিয়াঙ্কাকে ভালোবেসে আদালতের মাধ্যমে বিয়ে করেছিলেন গিরিশ। মেহসানা জেলার শাহপুর গ্রামের একেবারে শেষপ্রান্তের এক নির্জন বাড়িতে তাঁরা থাকতেন। শুরুতে দুই পরিবারের আপত্তি থাকলেও পরে তারা বিষয়টি মেনে নেয়। গিরিশ একটি কারখানার ডায়মন্ড পলিশ বিভাগে এবং প্রিয়াঙ্কা স্থানীয় একটি হাসপাতালে চাকরি শুরু করেন। তাঁদের সঙ্গেই থাকতেন গিরিশের মা, তবে বিয়ের এক বছরের মাথায় তিনি মারা যান। এরপরই প্রিয়াঙ্কার কোল জুড়ে আসে যমজ কন্যাসন্তান— পরী ও চাহাত।
প্রিয়াঙ্কার দাদা রমনভাই যোগী জানান, সন্তান হওয়ার পর প্রিয়াঙ্কা চাকরি ছেড়ে দিলে সংসারে খরচ ও আর্থিক সংকট বাড়তে থাকে। এ নিয়ে গিরিশ ও প্রিয়াঙ্কার মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। গিরিশ মাঝেমধ্যেই প্রিয়াঙ্কাকে নানা কটু কথা শোনাতেন, যা প্রিয়াঙ্কা ফোনে দাদাকে জানাতেন।
যেভাবে প্রকাশ পেল সত্য: রমনভাই জানান, ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে প্রিয়াঙ্কা তাঁকে শেষবার ফোন করেছিলেন, এরপর থেকে তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর গিরিশ ফোন করে রমনভাইকে জানান যে, প্রিয়াঙ্কা তাঁর মেয়ে পরীকে নিয়ে কোথাও চলে গেছেন এবং অন্য মেয়ে চাহাত গিরিশের কাছেই রয়েছে।
খবর পেয়ে রমনভাই গিরিশের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে থানায় ডায়েরি করার পরামর্শ দিলেও গিরিশ নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যান। গিরিশের আচরণে সন্দেহ হলে নিখোঁজের দীর্ঘ সাত মাস পর, চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল প্রিয়াঙ্কার দাদা থানায় একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন।
স্থানীয় থানার পুলিশ পরিদর্শক এম এন দাভে জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ গিরিশকে দুবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে। তদন্তের স্বার্থে গিরিশকে তাঁর বোনসহ থানায় আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কারণ গিরিশ কাজে যাওয়ার সময় মেয়ে চাহাতকে বোনের বাসায় রেখে যেতেন। কিন্তু বোনকে নিয়ে থানায় হাজির হওয়ার আগেই গত ৪ মে গিরিশ হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
পুলিশ পরবর্তীতে নিশ্চিত করেছে, উদ্ধারকৃত হাড়ের ডিএনএ ও নমুনা বিশ্লেষণ করে প্রমাণিত হয়েছে যে, সেগুলো গিরিশের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা এবং মেয়ে পরীর মরদেহের অবশিষ্টাংশ।
জেএইচআর