মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার মধ্যেই তেহরানের পারমাণবিক নীতি নিয়ে এক বিস্ফোরক মন্তব্য সামনে এসেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর প্রভাবশালী পুত্র এবং দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব মোজতবা খামেনেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পরিশোধিত বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো অবস্থাতেই ইরানের ভূখণ্ডের বাইরে পাঠানো হবে না। আমেরিকার অন্যতম প্রধান একটি শর্তকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে তাঁর এই ঘোষণা চলমান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিল।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী বা অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য পর্দার আড়ালে তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অন্য কোনো নিরপেক্ষ দেশে স্থানান্তর করার দাবি জানিয়ে আসছিল।
ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ছিল, এই ইউরেনিয়াম মজুদ থাকলে ইরান যেকোনো মুহূর্তে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম হতে পারে। কিন্তু মোজতবা খামেনেইর এই কড়া জবাব স্পষ্ট করে দিল যে, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবেই দেখছে, যা নিয়ে কোনো ধরনের আপস সম্ভব নয়।
পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য ইরান সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসন বারবার জোর দিয়ে আসছিল যে, ইরান যদি সত্যি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়, তবে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সিংহভাগ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে হবে। এটি ছিল মূলত ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির একটি পরিবর্তিত সংস্করণ বাস্তবায়নের চেষ্টা।
তবে মোজতবা খামেনেই এই দাবির মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। তেহরানে এক নীতি নির্ধারণী সভাায় তিনি মন্তব্য করেন, আমাদের বিজ্ঞানীদের রক্ত ও মেধার বিনিময়ে অর্जित সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের জাতীয় সম্পদ। এটি দেশের ভেতরেই থাকবে। কোনো বিদেশি শক্তির চাপের মুখে আমরা আমাদের কৌশলগত অর্জন ও পারমাণবিক সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দেব না।
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবার এই মন্তব্য কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এটি ইরানের গভীর শাসনব্যবস্থার আসল মনোভাবের প্রতিফলন।
দীর্ঘদিন ধরে চলা আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও জনজীবন বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি ছিল বিশ্ব সম্প্রদায়ের একমাত্র আশা। কিন্তু পারমাণবিক ইস্যুতে এই অনমনীয় অবস্থান আলোচনার টেবিলকে স্থবির করে দিতে পারে।
যুদ্ধবিরতি আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, মোজতবা খামেনেইর এই বক্তব্যের পর মার্কিন ও ইউরোপীয় মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, ওয়াশিংটনের জন্য ইউরেনিয়াম মজুদের বিষয়টি একটি চূড়ান্ত সীমা।
আলোচনার মূল অচলাবস্থা:
এই পুরো ঘটনার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খোদ মোজতবা খামেনেইর ভূমিকা। সাধারণত তিনি পর্দার আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত বিষয়ে তাঁর সরাসরি মন্তব্য করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর অবস্থান দিন দিন আরও সুসংহত হচ্ছে।
সরাসরি মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে মোজতবা দেশের অভ্যন্তরে থাকা রক্ষণশীল ও বিপ্লবী মনোভাবাপন্ন গোষ্ঠীগুলোর কাছে নিজের নেতৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করলেন। তিনি দেখাতে চাইলেন যে, পশ্চিমা শক্তির সামনে তেহরান মাথা নত করবে না। এই কঠোর বার্তা যেমন দেশের ভেতরের কট্টরপন্থীদের সন্তুষ্ট করবে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের অবস্থানকে আরও দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করবে।
মোজতবার এই বক্তব্যের পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েল এই ঘটনাকে তাদের পূর্ববর্তী আশঙ্কার সত্যতা হিসেবে দেখছে। তেল আবিব দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, ইরান আলোচনার আড়ালে আসলে পারমাণবিক বোমার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের শর্ত তেহরান নাকচ করে দেওয়ায় ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা বিভাগগুলো নতুন করে তাদের রণকৌশল সাজাতে পারে, যা যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ভেস্তে দিতে পারে।
অন্যদিকে, পারমাণবিক চুক্তির অন্যান্য অংশীদার যেমন চীন ও রাশিয়ার ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই দেশ বরাবরই ইরানের ওপর একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে। মোজতবার এই অনমনীয় অবস্থানের পর বেইজিং এবং ও মস্কো কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে।
মোজতবা খামেনেইর এই অনমনীয় বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা কেবল আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সুতা বাঁধা রয়েছে তেহরানের পারমাণবিক চুল্লির ভেতরের ইউরেনিয়ামের পরিমাণের সাথেও।
আমেরিকা যদি তাদের শর্তে অনড় থাকে এবং ইরান যদি তাদের ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আলোচনা খুব দ্রুতই ভেস্তে যেতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য আরও একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং ভয়াবহ সংঘাতের মুখোমুখি হতে পারে। বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের এই মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়।
জেএইচআর