ইরান 

যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এখনো কোন চুক্তি হয়নি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ০১:২৭ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, ওয়াশিংটনের সাথে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা বা চুক্তি অর্জিত হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, দুই দেশের মধ্যকার মতবিরোধ ও অমিলগুলো এখনো অত্যন্ত গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

এদিকে, এই যুদ্ধ পরিস্থিতি অবসান এবং মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাত ঠেকাতে নতুন করে কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এক আকস্মিক সফরে ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছেন এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন।

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে শুক্রবার ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছান পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। তেহরানে পৌঁছানোর পর তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির , সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন।

বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তা চলমান যুদ্ধ এবং এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আলোচনার মূল ফোকাস ছিল,কীভাবে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংঘাতের মাত্রা কমানো যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর 'চাপিয়ে দেওয়া' এই যুদ্ধের অবসান ঘটানো যায়।

বৈঠক শেষে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাকিস্তান এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে একটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বড় ধরনের যুদ্ধ সরাসরি পাকিস্তানের অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সফরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান পরোক্ষ আলোচনার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মুখপাত্র জানান যে, বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান সচল রয়েছে।

তবে তিনি পরিষ্কার করে দেন যে, আলোচনার টেবিল সচল থাকলেও কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি বা চুক্তি এখনো অনেক দূরে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের ভাষায়, 'যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যে আলোচনা চলছে, সেখানে দুই পক্ষের মধ্যকার মতবিরোধগুলো এখনো অত্যন্ত গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ । আমরা কূটনীতির পথ বন্ধ করিনি, তবে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।

মূলত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে দুই দেশের অবস্থান এখনো দুই মেরুতে রয়েছে, যার কারণে আলোচনা কোনো যৌক্তিক পরিণতি পাচ্ছে না।

ইরান সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে বারবার 'যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ' হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে ওমান উপসাগর, পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সাগর সংলগ্ন অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা আকাশচুম্বী। ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলা এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর থেকে পুরো অঞ্চল একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের শুরু থেকেই ইসরায়েলকে সরাসরি সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে আসছে, যা ইরানকে আরও ক্ষুব্ধ করেছে। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটন যদি ইসরায়েলকে অন্ধ সমর্থন দেওয়া বন্ধ না করে এবং ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয়, তবে এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের এই তেহরান সফর আন্তর্জাতিক মহলে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তান একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের একটি দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার, অন্যদিকে ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ফলে, এই সংঘাত থামাতে পাকিস্তানের একটি অনন্য ভূমিকা রয়েছে।

ইসলামাবাদ চাইছে ওমান বা কাতারের মতো অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সাথে সুর মিলিয়ে ইরান এবং পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে একটি সাধারণ সমঝোতার রাস্তা তৈরি করতে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার আদর্শিক এবং সামরিক বৈরিতা এত তীব্র যে, কেবল পাকিস্তানের একক চেষ্টায় এই যুদ্ধ থামানো বেশ কঠিন হবে।

আল জাজিরার লাইভ ডেস্কে কর্মরত সাংবাদিক হেবা হাবিবের , প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের কূটনৈতিক পাড়ায় যখন আলোচনার ঝড় বইছে, তখন সীমান্ত এবং সমুদ্রসীমায় সামরিক সতর্কতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলসীমাগুলোতে টহল দিচ্ছে, যা যেকোনো সময় নতুন কোনো সামরিক সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা যেকোনো ধরনের বিমান বা নৌ আগ্রাসন প্রতিহত করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। একই সাথে তারা ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছে, কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ চিরকাল খোলা থাকবে না। যদি যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করতে চায়, তবে তাদের আলোচনার টেবিলে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে আসতে হবে, কেবল ফাঁকা প্রতিশ্রুতি বা হুমকির রাজনীতি দিয়ে ইরানকে দমানো যাবে না।

মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে মন্দার শঙ্কা তৈরি করেছে। জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আপাতত সবার চোখ ওমান ও অন্যান্য কূটনৈতিক চ্যানেলের দিকে, যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ আলোচনা চলছে। তেহরান যেহেতু পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে 'এখনো কোনো চুক্তি হয়নি' তাই আগামী দিনগুলোতে এই আলোচনার মোড় কোন দিকে ঘোরে এবং পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো এই যুদ্ধ থামাতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে- তাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: আল- জাজিরা

এএন