বিজেপি ও আন্নামালাইয়ের বিচ্ছেদ কি তবে চূড়ান্ত?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ২, ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

নয়াদিল্লি ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তামিলনাড়ুর প্রাক্তন রাজ্য বিজেপি সভাপতি কে. আন্নামালাইয়ের মধ্যকার সম্পর্ক কি চিরতরে ছিন্ন হতে চলেছে? এই প্রশ্নটিই এখন ভারতের রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

মঙ্গলবার সকালে আন্নামালাই বিজেপির সর্বভারতীয় কার্যকারী সভাপতি নিতিন নবীন এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিএল সন্তোষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের পর থেকেই আন্নামালাইয়ের বিজেপি ছাড়ার গুঞ্জন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, আন্নামালাই দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি এখন নিজের একটি স্বতন্ত্র পথ তৈরি করতে চান এবং অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশেই দল থেকে বিদায় নিতে ইচ্ছুক।

নেতৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা, কিন্তু আন্নামালাই অনড়

বিজেপির জাতীয় নেতৃত্ব এখনও আন্নামালাইকে দলে ধরে রাখার এবং তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এই প্রাক্তন আইপিএস  অফিসার ইতিমধ্যেই নিজের মনস্থির করে ফেলেছেন। আন্নামালাইয়ের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিজেপির ভেতরে তিনি নিজের কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন না।

দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে যে, ড্যামেজ কন্ট্রোল বা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অংশ হিসেবে আন্নামালাইকে রাজ্যসভার একটি আসনও প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

প্রথমে সামাজিক আন্দোলন, পরে নতুন রাজনৈতিক দল

আন্নামালাইয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা পরিকল্পনা ও ধারণার কথা সামনে আসছে। সূত্রগুলো বলছে, তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল ঘোষণার আগে একটি ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক বা আদর্শিক আন্দোলন শুরু করতে পারেন।

এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হবে সমমনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের একত্রিত করা এবং একটি শক্তিশালী ও নিবেদিতপ্রাণ ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। নতুন এই উদ্যোগটি অত্যন্ত বড় পরিসরে পরিচালিত হবে, যেখানে সমাজের বিভিন্ন পেশা এবং সামাজিক স্তরের মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হবে।

বর্তমানে আন্নামালাই 'উই দ্য লিডারস' নামে একটি অলাভজনক নেতৃত্ব উন্নয়নমূলক সংস্থা পরিচালনা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংস্থাটিই তাঁর আগামী দিনের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করতে পারে।

 উপ-নির্বাচনে প্রথম পরীক্ষা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্নামালাই ভবিষ্যতে যে রাজনৈতিক দলই গঠন করুন না কেন, তামিলনাড়ুর আসন্ন বিধানসভা উপ-নির্বাচনগুলো হবে তাঁর জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। এই উপ-নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে তিনি নিজের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

এই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনটি এমন একটি সময়ে ঘটছে যখন মাত্র এক মাস আগে তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। সেই নির্বাচনে ২৩৪ আসনবিশিষ্ট তামিলনাড়ু বিধানসভায় বিজেপি মাত্র ১টি আসনে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়, যা দলের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক ছিল।

তামিলনাড়ুতে বিজেপির উত্থান ও আন্নামালাই ম্যাজিক

তামিলনাড়ুর রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে দুটি দ্রাবিড় দল- ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে -এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই কঠিন রাজনৈতিক ভূমিতে আন্নামালাই যখন রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নেন, তখন তিনি বিজেপির দৃশ্যমানতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে তুলেছিলেন।

ডিএমকে সরকারের দুর্নীতি ও বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তাঁর আক্রমণাত্মক প্রচার কৌশল রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রাজ্যজুড়ে তাঁর দীর্ঘ পদযাত্রা এবং জনসংযোগ কর্মসূচি সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দারুণ সক্রিয়তার কারণে তামিলনাড়ুর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তিনি একটি বিশাল নিজস্ব অনুসারী দল বা ফ্যান বেস তৈরি করতে সক্ষম হন।

মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং জোটের রাজনীতি

আন্নামালাই সবসময় বিশ্বাস করতেন যে, তামিলনাড়ুতে বিজেপির এককভাবে বা স্বাধীনভাবে নির্বাচন লড়া উচিত। বিগত কয়েক বছরে দল যে জনসমর্থন তৈরি করেছে, তার ওপর ভিত্তি করেই তিনি এগোতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে। তারা ডিএমকে-কে পরাস্ত করতে এবং বিরোধী ভোটব্যাংক একত্র করতে পুনরায় এআইএডিএমকে -এর সঙ্গে জোট গঠন করে।

এই জোট প্রক্রিয়াই মূলত আন্নামালাইয়ের বিদায়ের পথ প্রশস্ত করে। এআইএডিএমকে সাধারণ সম্পাদক এডাপ্পাদি কে পলানিস্বামী স্পষ্ট শর্ত দিয়েছিলেন যে, জোটে ফিরতে হলে তামিলনাড়ু বিজেপির নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হবে। ফলস্বরূপ, আন্নামালাইকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় নয়নার নাগেন্দ্রনকে রাজ্য সভাপতি করা হয়।

কোণঠাসা আন্নামালাই এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই আন্নামালাইকে দলে ক্রমশ কোণঠাসা বা সাইডলাইন করে রাখার গুঞ্জন জোরালো হয়। তিনি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেননি এবং দলের নির্বাচনী প্রচারেও তাঁকে খুব একটা অগ্রভাগে দেখা যায়নি।

কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু সিদ্ধান্তের সঙ্গেও তাঁর সাম্প্রতিক দ্বিমত প্রকাশ পেয়েছিল, যা তাঁর দল ছাড়ার জল্পনাকে আরও উস্কে দেয়। অবশেষে দিল্লির দরবারে নিতিন নবীনের সঙ্গে দেখা করে তিনি তাঁর ' cordial separation' বা সৌহার্দ্যপূর্ণ বিদায়ের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে আন্নামালাইয়ের এই নতুন ইনিংস দ্রাবিড় রাজনীতির দুর্গে কতখানি ফাটল ধরাতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

এএন