কিয়েভ, মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মাঝেই ইউক্রেনজুড়ে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। সোমবার দিবাগত রাতভর চালানো এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দিনিপ্রো শহরে ৯ জন এবং রাজধানী কিয়েভে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে এটিকে মস্কোর সবচেয়ে বড় এবং অন্যতম বিধ্বংসী আকাশাভিযান বলে বর্ণনা করছে কিয়েভ প্রশাসন। হামলার তীব্রতায় বহু বহুতল আবাসিক ভবন ধসে পড়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার আগেই সমগ্র ইউক্রেনজুড়ে একযোগে বিমান হামলার সাইরেন বা এয়ার রেইড অ্যালার্ট বেজে ওঠে। কিয়েভের আকাশজুড়ে রাশিয়ান আত্মঘাতী ড্রোনের তীব্র গুঞ্জন এবং তার পরপরই একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা রাজধানী। কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিটস্কো নাগরিকদের অবিলম্বে নিরাপদ বাঙ্কার বা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানের জন্য জরুরি নির্দেশ জারি করেন।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাশিয়া অত্যন্ত নিখুঁত ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলা চালিয়েছে। হামলার ফলে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে একটি পেট্রোল পাম্প, একটি নির্মাণাধীন ভবন, দুটি সাধারণ বসতবাড়ি এবং বেশ কয়েকটি বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পর বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ঢেকে যায় কিয়েভের আকাশ। আগুন নেভাতে এবং ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিতদের উদ্ধার করতে উদ্ধারকারী দল ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রাতভর উদ্ধারকাজ চালান। এই হামলার পর কিয়েভসহ দেশটির একটি বিশাল অংশে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বিপর্যয় বা ব্ল্যাকআউট দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, দিনিপ্রো শহরের চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ। সেখানে রাশিয়ার একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আবাসিক এলাকায় আঘাত হানলে নয়জন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশু ও নারী রয়েছেন। দিনিপ্রোর মেয়র জানিয়েছেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কারণ অনেক ভবনের ছাদ ও দেয়াল ধসে পড়েছে।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া এই একক অভিযানে স্মরণকালের অন্যতম সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে। মঙ্গলবার সকালে এক জরুরি ভিডিও বার্তায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হামলার অফিসিয়াল পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
জেলেনস্কি জানান, রাশিয়া রাতভর অভিযানে মোট '৬৫৬টি আত্মঘাতী ড্রোন' এবং ব্যালিস্টিক, ক্রুজ ও অ্যান্টি-শিপসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির '৭৩টি ক্ষেপণাস্ত্র' নিক্ষেপ করেছে। অর্থাৎ, সর্বমোট ৭২৯টি আকাশযান নিয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যুহ ভাঙার চেষ্টা করে মস্কো। তবে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এর মধ্যে ৬৪২টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ।
এছাড়া উত্তর-পূর্বের শহর খারকিভের মেয়র ইহর তেরেখভ জানিয়েছেন, সেখানেও রাতভর ড্রোন হামলায় একটি শিশুসহ অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কারখানায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
এই ভয়াবহ হামলার পর ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পশ্চিমা সামরিক সহায়তার ঘাটতি আবারও প্রকটভাবে সামনে এসেছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আমেরিকার কাছে জরুরি ভিত্তিতে 'প্যাট্রিয়ট' ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইন্টারসেপ্টর বা মিসাইল সরবরাহের আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
বর্তমানে ইউক্রেনের কাছে এই আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সংকটের পেছনে দুটি মূল কারণ কাজ করছে-
১. আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের উৎপাদিত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের সুরক্ষায় পাঠাচ্ছে। ফলে ইউক্রেনের ভাগের রসদ কমে গেছে।
২. ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইউক্রেন নীতি: গত বছর আমেরিকার ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনে সরাসরি মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক তহবিল সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন। এর ফলে ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্ররা (যেমন যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স) এখন নিজেদের অর্থ দিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কিনে তা ইউক্রেনে পাঠাচ্ছে। এই পরোক্ষ ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে কিয়েভের হাতে সময়মতো প্রয়োজনীয় অস্ত্র পৌঁছাচ্ছে না, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ইউক্রেনীয়দের।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই বিধ্বংসী হামলার দায় স্বীকার করে একে একটি 'দাপ্তরিক ও ন্যায়সংগত প্রতিশোধ' বলে উল্লেখ করেছে। মস্কোর দাবি, ইউক্রেনীয় বাহিনী কর্তৃক পূর্বে চালানো হামলার জবাবেই এই পাল্টা আক্রমণ এবং তাদের নির্ধারিত 'স্ট্রাইক অবজেক্টিভ' বা লক্ষ্যমাত্রাগুলো সফলভাবে অর্জিত হয়েছে।
গত সপ্তাহে রাশিয়া অধিকৃত পূর্ব ইউক্রেনের একটি ছাত্রাবাসে, ইউক্রেনীয় বাহিনী মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যাতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়। রাশিয়া এটিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা বলে দাবি করে ইউক্রেনজুড়ে 'পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিক হামলা' চালানোর হুমকি দিয়েছিল।
তবে কিয়েভের দাবি ছিল, ওই ছাত্রাবাসটিকে রাশিয়া একটি সামরিক ঘাঁটি এবং সেনা ব্যারাক হিসেবে ব্যবহার করছিল, তাই সেখানে হামলা চালানো সম্পূর্ণ বৈধ ছিল।
গত মে মাসে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া একটি সংক্ষিপ্ত ও সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই রাশিয়া নতুন করে কিয়েভের ওপর একের পর এক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু দিন আগেই কিয়েভের একটি আবাসিক ব্লকে রুশ হামলায় ২৪ জন নিহত হন, যার মধ্যে তিনটি শিশুও ছিল। এর জবাবে ইউক্রেনও রাশিয়ার রাজধানী মস্কো অঞ্চলে ড্রোন হামলা চালায়, যাতে ৩ জন রাশিয়ান নিহত হন। জেলেনস্কি তখন স্পষ্ট বলেছিলেন, রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলা চালানো ইউক্রেনের জন্য সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও আত্মরক্ষার অংশ।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক কড়া বিবৃতিতে বলেছে, রাশিয়া যেভাবে সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে এবং হুমকি দিচ্ছে, তা আসলে 'লজ্জাহীন ব্ল্যাকমেইল' বা কাপুরুষোচিত হুমকি ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইউক্রেন বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আহ্বান জানিয়েছে যেন মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ আরও বৃদ্ধি করা হয়। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই পূর্ণাঙ্গ রুশ আগ্রাসন ২০২৬ সালে এসে আরও বেশি রক্তক্ষয়ী ও জটিল রূপ ধারণ করেছে, যার অবসান কোন পথে তা এখনও অনিশ্চিত।
এএন