ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বা যুদ্ধ শুরুর পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল যুক্তি ছিল- ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। সম্প্রতি দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা দফায় দফায় শান্তি আলোচনা যখন মার্কিন-ইরান যুদ্ধ বন্ধে তেমন কোনো বড় অগ্রগতি দেখাতে পারছে না, ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক মস্ত বড় ‘সাফল্য’ বা ‘ব্রেকথ্রু’-এর দাবি করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন যে, তিনি ইরানি নেতাদের কাছ থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার একটি বড় প্রতিশ্রুতি বা গ্যারান্টি আদায় করে নিয়েছেন। তবে ট্রাম্পের এই আত্মতুষ্টি এবং বড়সড় দাবির মুখে পরমাণু বিশেষজ্ঞরা বেশ অবাক এবং বিভ্রান্ত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না—এই প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়, বরং গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তেহরান আন্তর্জাতিক মহলে এই একই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে।
ট্রাম্পের দাবি ও সাম্প্রতিক বক্তব্য
গত মাসে ফক্স নিউজে নিজের পুত্রবধূ লারা ট্রাম্পকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আমার কাছে সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি বা শর্ত ছিল একটাই- ইরানের কোনো পরমাণু অস্ত্র থাকা চলবে না। ইরান সেই শর্তে রাজি হয়েছে এবং বিষয়টি বেশ আকর্ষণীয় ছিল।
সোমবার ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’-এর একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে ট্রাম্প আবারও একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বলেন, তারা ইতিমধ্যেই মেনে নিয়েছে যে তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না। এটি এমন একটি বিষয় ছিল যা তাদের মানতেই হতো এবং তারা তা মেনে নিয়েছে। এটাই ছিল সবচেয়ে বড় বিষয়।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো এমন এক সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। তবে ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ট্রাম্প যেটিকে তার প্রশাসনের একার সাফল্য বা ‘মস্ত বড় চুক্তি’ হিসেবে দেখাতে চাইছেন, তা আসলে কয়েক দশক পুরোনো এক কূটনৈতিক অবস্থানের পুনরাবৃত্তি মাত্র।
পরমাণু বিশেষজ্ঞরা দ্রুতই মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি এই প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে দেয়নি। এর পেছনে সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, ১৯৭০ সালের পরমাণু অপ্রসার চুক্তি (NPT) ইরান ১৯৭০ সালেই ‘নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি’ বা পরমাণু অপ্রসার চুক্তিতে অনুস্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মূল শর্তই হলো- স্বাক্ষরকারী অ-পরমাণু রাষ্ট্রগুলো কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। ইরান অর্ধশতাব্দী ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির অংশীদার।
সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার ফতোয়া,ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী ২০০৩ সালেই একটি ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা বা ‘ফতোয়া’ জারি করেছিলেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, মজুত এবং ব্যবহার করা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ। ইরানি কর্মকর্তারা গত দুই দশক ধরে প্রতিটা আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই ফতোয়াকে তাদের পরমাণু অস্ত্র না বানানোর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি (JCPOA) ওবামা প্রশাসনের আমলে ২০১৫ সালে যখন ইরান ও বিশ্বের ছয়টি পরাশক্তির মধ্যে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি সই হয়, তখনও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত রাখতে এবং কোনো অবস্থাতেই সামরিক উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার না করতে সম্মত হয়েছিল। (পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়েছিলেন)।
তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান ট্রাম্পের আলোচনার টেবিলে এসে নতুন কোনো ছাড় দেয়নি, বরং তাদের চিরন্তন কূটনৈতিক অবস্থানটিই পুনর্ব্যক্ত করেছে মাত্র।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এই শান্তি আলোচনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে, যা বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং জটিলতাকে প্রকাশ করে।
লেবাননে হোয়াইট ফসফরাসের ব্যবহার
লেবাননে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ‘হোয়াইট ফসফরাস’ বা শ্বেত ফসফরাস নামক এক অত্যন্ত ক্ষতিকারক রাসায়নিক ও অগ্নিসংযোগকারী পদার্থ ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা এবং বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা লেবাননের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর ব্যবহারের দৃশ্যমান প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীর মারাত্মকভাবে পুড়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।
নেতানিয়াহুর সাথে ট্রাম্পের ফোনালাপ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে তার ব্যক্তিগত ফোনালাপের কিছু অংশ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তাদের দুজনের মধ্যে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। এই তীব্র মতভেদের কারণে ট্রাম্প একপর্যায়ে ইসরায়েলি নেতাকে ব্যক্তিগতভাবে ‘পাগল’ বলেও সম্বোধন করেছিলেন।
হিজবুল্লাহর ‘ফাইবার-অপটিক ড্রোন’
ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একের পর এক ড্রোন হামলা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা বা ফাটলগুলোকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত নতুন ‘ফাইবার-অপটিক গাইডেড ড্রোন’ ইসরায়েলি জনগণকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই প্রযুক্তির কারণে ড্রোনগুলোকে জ্যাম বা ভূপাতিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যার ফলে ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব জরুরি ভিত্তিতে এর সমাধান খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।
দুবাইয়ের প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে দুবাইয়ের মতো বাণিজ্যিক শহরগুলোতেও। দুবাইয়ে কর্মরত অভিবাসী বা প্রবাসী শ্রমিকরা তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
একদিকে ঋণের বোঝা, একাকীত্ব ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ক্লান্তি; তার ওপর যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আতঙ্ক। এই পরিস্থিতিতে এই শ্রমিকদের জন্য আয়োজিত কিছু নিখরচায় মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বা স্ট্রেস-ম্যানেজমেন্ট ক্লাস সাময়িক স্বস্তির মরূদ্যান হয়ে উঠেছে।
ইরানি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
যুদ্ধ ও কূটনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি চলছে অর্থনৈতিক যুদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র এবং এর কয়েকজন প্রতিষ্ঠাতার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এই ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জটি ব্যবহার করে ইরান সরকার মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিচ্ছে, বিভিন্ন উগ্রবাদী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর অর্থায়ন করছে এবং দেশের বাইরে অবৈধভাবে বিপুল অর্থ পাচার করছে।
এএন