ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তির অংশ হিসেবে অবশেষে ইরানের সব বন্দর ও উপকূলীয় এলাকা থেকে দীর্ঘদিনের সামরিক নৌ অবরোধ পুরোপুরি তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম) গতকাল বৃহস্পতিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
সেন্টকোমের সেই বিবৃতিতে বলা হয়, “ইরানি বন্দরগুলোতে জাহাজের আসা-যাওয়া, চলাচলে আর বাধা দেবে না মার্কিন বাহিনী। যেসব সামরিক অবরোধ জারি করা হয়েছিল, সব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।”
গত ১৭ জুন বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্তই ছিল, ইরানের বন্দরগুলো এবং সমুদ্র উপকূল থেকে সব ধরনের সামরিক অবরোধ দ্রুত প্রত্যাহার করে নেবে যুক্তরাষ্ট্র।
চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র একদিনের মধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কার্যকর করা হলো সেই শর্ত। এখন আন্তর্জাতিক মহলের সব চোখ ও অপেক্ষা কেবল হরমুজ প্রণালি থেকে ইরানের পাল্টা অবরোধ তুলে নেওয়ার ওপর।
তেহরানের পরমাণু প্রকল্প ঘিরে সৃষ্ট তীব্র টানাপোড়েনের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক অভিযান শুরু করার দিনই গুরুত্বপূর্ণ এই বৈশ্বিক বাণিজ্য জলপথে কঠোর অবরোধ জারি করেছিল ইরান।
অবরোধ আরও জোরদার করতে ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালির বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে শত শত জলমাইনও পেতে রেখেছিল ইরান, যা এখনও বহাল আছে।
হরমুজ থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং এই প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও অবাধ চলাচলের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া ছিল এই চুক্তির অন্যতম শর্ত।
তবে ইরানের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির অবরোধ প্রত্যাহার কিংবা মাইন অপসারণ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো দাপ্তরিক তথ্য আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স অবশ্য বেশ আশাবাদী যে ইরান খুব শিগগিরই হরমুজ ইস্যুতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।
বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে।”
তিনি সাংবাদিকদের আরও জানান, চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরান টানা দুই রাত হরমুজে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে সব ধরনের হামলা করা থেকে পুরোপুরি বিরত থেকেছে।
ভ্যান্স আরও দাবি করেন, এই দুই রাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে পরিবহন করা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল। আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে এই তথ্য পুরোপুরি যাচাই করতে পারেনি।
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গোয়েন্দা সংস্থা কেপলার সিএনবিসিকে জানায়, গত ২ দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে ৩টি তেলবাহী বড় ট্যাংকার জাহাজ চলাচল করেছে, যার সম্মিলিত তেলের পরিমাণ ছিল ৬০ লাখ ব্যারেল।
বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও সরবরাহকৃত জ্বালানিপণ্যের ২০ শতাংশই মূলত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন এই প্রনালি দিয়ে গড়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ৬০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত তেল ও তরল গ্যাস বিশ্ববাজারে যেত।
ইরান আকস্মিক এই অবরোধ জারি করার পর জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুতর ব্যাঘাত ঘটে।
যার ফলে একদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে তেল ও গ্যাসের দাম।
সিএনবিসিকে কেপলার জানায়, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা চুক্তির শর্তগুলো যথাযথ এবং সৎভাবে মেনে চলে, তাহলেও তেলের বাজার স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে কমপক্ষে ২ মাস।
সূত্র: সিএনবিসি
এএন