ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দ্বিতীয় দিনে রাজধানী তেহরান পরিণত হয়েছে শোকাহত মানুষের বিশাল সমাবেশে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতও থেমে নেই। যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকার দাবি থাকলেও দক্ষিণ লেবানন, গাজা উপত্যকা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন করে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে।
সোমবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ও আশপাশের সড়কে লাখো মানুষ খামেনেইকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মিলিয়ন মানুষ শোকযাত্রায় অংশ নেন। টেলিভিশন সম্প্রচারিত দৃশ্যে দেখা যায়, মানুষ কফিনের দিকে ফুল নিক্ষেপ করছেন, বুক চাপড়ে শোক প্রকাশ করছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরানের নেতৃত্ব দেওয়া আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হন। তার মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত এই শোকানুষ্ঠানকে অনেকেই ইরানের জাতীয় সংহতি ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং শীর্ষ পরমাণু আলোচনাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের মৌলিক মতপার্থক্য ও বৈরিতা এখনো বহাল রয়েছে। তবে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত Memorandum of Understanding (MoU) বাস্তবায়ন কঠিন হলেও অসম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয় এবং লেবাননের স্থিতিশীলতার জন্যও তেহরানের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খামেনেইকে হত্যার দায় স্বীকার করে দাবি করেছেন, এটি ছিল ইসরায়েলের নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া একটি পদক্ষেপ। তার অভিযোগ, খামেনেই ইসরায়েলকে ধ্বংস করার পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে কোনো ইরানি নেতা যদি একই ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লেবাননেও উত্তেজনা কমেনি। গত মাসে মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি হওয়ার পরও দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিহ এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, হামলায় একটি আবাসিক ভবন ধসে পড়ে এবং অন্তত চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এতে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গাজা উপত্যকায়ও সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চালানো হামলায় অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৬ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ফিলিস্তিনের 'কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশন' জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতিস্থাপনকারীদের মোট ১১ হাজার ৭৪টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে বাড়িঘর ভাঙচুর, কৃষিজমি ও জলপাই বাগান ধ্বংস, শারীরিক নির্যাতন এবং প্রাণহানির ঘটনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, গাজা ও লেবাননকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও একের পর এক সামরিক অভিযান ও পাল্টাপাল্টি হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এম জি