ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে দেখতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। যদিও এ বিষয়ে ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত অবস্থান কিংবা তার সঙ্গে ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের বিশ্বকাপ আয়োজনকে ঘিরে ট্রাম্প ও সুইস বংশোদ্ভূত ইনফান্তিনোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো বিভিন্ন সময় ট্রাম্পকে বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রাখার উদ্যোগ নেন। এমনকি গত ডিসেম্বরে ট্রাম্পকে ফিফার প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ও প্রদান করেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনে করেন ইনফান্তিনো বিশ্বজুড়ে সম্মানিত একজন ব্যক্তি এবং মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার বিশেষ সক্ষমতা তার রয়েছে।
বর্তমান জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে শেষ হবে। এরপরই নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের অনুমোদন পাওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া পাঁচ স্থায়ী সদস্যের যেকোনো একটি দেশের ভেটো নতুন প্রার্থীকে আটকে দিতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের পর সাধারণ পরিষদের সমর্থনও অর্জন করতে হবে।
তবে ইনফান্তিনো এই পদে আগ্রহী কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প তার সঙ্গে এ বিষয়ে সরাসরি আলোচনা করেছেন কি না, সে সম্পর্কেও কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবু ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের ধারণা, বর্তমান প্রার্থীদের তুলনায় ইনফান্তিনোর গ্রহণযোগ্যতা বেশি হতে পারে। একটি সূত্র নিউ ইয়র্ক পোস্টকে জানিয়েছে, ট্রাম্প বাকি সাতজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে মনে করছেন।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন চিলির সাবেক সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশেলে। তবে তার প্রার্থিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া আছেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক ও আর্জেন্টিনার নাগরিক রাফায়েল গ্রসি। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ইস্যুকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন যুক্তরাজ্যের আপত্তি আসার সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রচলিত আঞ্চলিক ভারসাম্যের ধারায় পরিবর্তন আসতে পারে। সাধারণভাবে এই পদে অঞ্চলভিত্তিক পালাক্রমে প্রার্থী নির্বাচনের একটি অলিখিত রীতি রয়েছে। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে সর্বশেষ মহাসচিব ছিলেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুইয়ার, যিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তবে একাধিক সূত্রের দাবি, এই অলিখিত নীতি ইনফান্তিনোর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না এবং তিনি একাধিক দেশের সমর্থনও পেতে পারেন।
ট্রাম্পের বিশেষ দূত পাওলো জাম্পোল্লি নিউ ইয়র্ক পোস্টকে বলেন, এমন ব্যতিক্রমী ধারণা কেবল ট্রাম্পের পক্ষেই সম্ভব। তার মতে, ইনফান্তিনো জাতিসংঘে নতুন গতি আনতে সক্ষম হবেন এবং খেলাধুলার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করতে পারবেন। তিনি বলেন, বিশ্বের তরুণ সমাজ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকেও ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করার সক্ষমতা রয়েছে ফিফা সভাপতির।
জাম্পোল্লির ভাষ্য, জাতিসংঘে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে কাজ করতে হয়, আর ফিফার সদস্যসংখ্যা ২০০-এরও বেশি। তার মতে, এত বড় একটি বৈশ্বিক সংস্থা সফলভাবে পরিচালনার অভিজ্ঞতা ইনফান্তিনোর রয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা জাতিসংঘ পরিচালনায়ও কার্যকর হতে পারে।
জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনামুখর। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত মোকাবিলায় সংস্থাটির ভূমিকা নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তিনি ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন উদ্যোগ চালু করেন। তখন অনেকেই এটিকে জাতিসংঘের বিকল্প কোনো কাঠামো হিসেবে দেখলেও ট্রাম্প সেই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন। তার বক্তব্য ছিল, জাতিসংঘকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকায় দেখতে চান তিনি। এ সময় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে শান্তি চুক্তিসহ কয়েকটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠায়ও তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।
হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনেস্কো এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদসহ সংস্থাটির কয়েকটি অঙ্গসংগঠন থেকেও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইনফান্তিনো যদি জাতিসংঘের মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে। তবে আর্থিক দিক থেকে এটি ইনফান্তিনোর জন্য বড় ত্যাগের বিষয় হতে পারে। বর্তমানে ফিফা সভাপতি হিসেবে তার বার্ষিক আয় প্রায় ৬০ লাখ ডলার, যেখানে জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্ষিক বেতন প্রায় ৪ লাখ ১৮ হাজার ডলার।
এদিকে ইনফান্তিনো ইতোমধ্যে ফিফা সভাপতির পদে পুনর্নির্বাচনের জন্য নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। আগামী মার্চে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে তিনি আবারও নেতৃত্ব ধরে রাখার লক্ষ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এএন