অভিমানেই আর ফিরলেন না বিচারপতি ইমান আলী

মো. মাসুম বিল্লাহ প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৫, ২০২২, ০৬:১৩ পিএম

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী আজ ১৫ ডিসেম্বর শেষ দিনের মতো অফিস করছেন। আগামী রোববার অফিস খোলা থাকলেও তিনি ওই দিনের জন্য ছুটি নিয়েছেন বলে জানা গেছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর তিনি অবসরে যাবেন। আজ সকাল সাড়ে ৮টায় তিনি সুপ্রিম কোর্টে আসেন। তবে আপিল বিভাগের বিচারকাজে অংশগ্রহণ করেননি। যদিও আপিল বিভাগের মূল কার্যতালিকায় প্রধান বিচারপতির নামের পরই বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর নাম রয়েছে। তবুও তিনি ফেরেননি নিজ বিচারালয়ে।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবীরা বলছেন, প্রধান বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা মানা হয়নি। এজন্যই হয়তো তিনি অভিমান করে আর বিচারকাজে বসেননি। আদালতেও আসেননি। ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশের ২৩ তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীকে। একদিন পরেই ৩১ ডিসেম্বর থেকে স্বেচ্ছায় ছুটিতে যান জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী। সে ছুটির মেয়াদ ছিল ৩১ মার্চ পর্যন্ত। কিন্তু ছুটি শেষ হওয়ার আগেই ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুনরায় বর্ধিত ছুটি চেয়ে গত ২৮ মার্চ প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেন। আবেদনে লন্ডনে থাকা বৃদ্ধ মায়ের সাথে ছুটিকালীন সময় কাটানোর কথা উল্লেখ করা হয়। পরে ওই ছুটির আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হলে তা মঞ্জুর করা হয়। এর পরে আর তিনি ফেরেননি।  

এদিকে বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী আগামী ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যাবেন। ১৯ ডিসেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্টে অবকাশকালীন ছুটি শুরু হবে। ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রিমকোর্ট দিবস পালন করা হবে। সে হিসেবে আজ ছিল তার শেষ কর্মদিবস। এদিন দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের সাথে তাকে কুশল বিনিময় করতে দেখা যায়। কেউ কেউ ফুল দিয়েও তাকে বিদায় জানান।  

জানা গেছে, প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন বর্তমানে এমন চারজন বিচারপতি রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে শীর্ষে রয়েছেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী। অন্য তিনজন হলেন- বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান ননী এবং বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ আইনজ্ঞ ও সুশীলসমাজের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগদানের পক্ষে মত প্রদান করলেও গত দুদশকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘিত হয়েছে। মানা হয়নি কোন জেষ্ঠ্যতাও। সরকারের ইচ্ছায়ই নানা সময়ে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্র অনুযায়ী, আপিল বিভাগের বর্তমান বিচারপতিদের মধ্যে বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান ২০২৩ সালের ৩০ জুন এবং বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি অবসরে যাবেন। জ্যেষ্ঠতা না মেনে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের জের ধরে এর আগে বিচারপতির পদত্যাগের নজিরও রয়েছে।

প্রসঙ্গত, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রথম আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. রুহুল আমিনকে ডিঙিয়ে ২০০৩ সালের ২৩ জুন বিচারপতি কে এম হাসানকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় দফা বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিমকে ডিঙিয়ে বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছের হোসেনকে ২০০৪ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১ মার্চ বিচারপতি এম এম রুহুল আমিনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিমকে ডিঙিয়ে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ পর্যন্ত চারবার জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিমকে ডিঙিয়ে বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলামকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে নিয়োগ দেওয়া হয় বিচারপতি এম এ মতিন ও বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানকে ডিঙিয়ে। পরে ওই দুই বিচারপতি মেয়াদ থাকা অবস্থায় আর বিচার কাজে অংশ নেননি। এরপর ২০১১ সালের ১২ মে বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে দ্বিতীয় দফা জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের শিকার হন বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান। পরে তিনি ৭ মাসের বেশি সময় ছুটিতে থাকার পর ২০১১ সালের ১২ মে পদত্যাগ করেন। ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে নিয়োগ দেওয়ায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করেছিলেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা।

২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা পদত্যাগ করার পর প্রায় ৩ মাস প্রধান বিচারপতির পদটি শূন্য ছিল। এ সময় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। এবারও ২৩তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হয়েছে জেষ্ঠ্যতা লঙ্ঘন করে। আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ইমান আলীকে নিয়োগ না দিয়ে দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিক ভাবে মার্চ পর্যন্ত ছুটিতে যান বিচারপতি ইমান আলী। এ নিয়ে ২৩ জন প্রধান বিচারপতির মধ্যে ১৪ জনকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলো ৯ বার।

এবি