বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সি এম এম) আদালত। রাজধানীজুড়ে সংঘটিত অপরাধ, আইনি বিরোধ, তদন্ত, ও জামিন–বাতিলের মতো হাজারো জটিল মামলার প্রাথমিক বিচার এখানেই শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই আদালত শুধু বিচার কার্যক্রম নয়, বরং জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন রক্ষায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ৫ আগস্টের পর থেকে আদালতের কার্যক্রমে এসেছে নতুন গতি, নতুন শৃঙ্খলা এবং সর্বোপরি বিচারের প্রতি জনআস্থার পুনর্জাগরণ।
বিচার ব্যবস্থার প্রথম ধাপ: সি এম এম আদালতের ভূমিকা
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর হলো মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। দেশের রাজধানীতে এই আদালত প্রতিদিন হাজারো মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা করে যাচ্ছে। সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা ব্যবসায়ী ও সবার জন্য আইনের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই আদালতের মূল লক্ষ্য।
ঢাকা সি এম এম আদালত বর্তমানে প্রায় ৫০ জন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তি করছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী আদালতের বিভিন্ন শাখা পৃথকভাবে দায়িত্ব পালন করছে, যেমন ট্রাফিক আদালত, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা, বিশেষ ক্ষমতা আইন, চাঁদাবাজি বা প্রতারণা মামলা ইত্যাদি।
৫ আগস্ট পরবর্তী সংস্কার: জবাবদিহিতা ও নেতৃত্বে পরিবর্তন
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট আদালত প্রশাসনের অভ্যন্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি হয়। তাতে বলা হয়, বিচার প্রার্থীরা যেন সময়মতো ন্যায়বিচার পান, মামলার বিলম্ব কমানো হয় এবং প্রতিটি রায়ের পেছনে যুক্তি-তথ্য ও আইনি ভিত্তি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের (CMM) নেতৃত্বে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে শুরু হয় এক ধারাবাহিক সংস্কার উদ্যোগ-
এই সংস্কার কার্যক্রমের ফলে আদালতের কর্মক্ষমতা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। একাধিক বিচারক জানিয়েছেন, এখন আদালতে মামলার জট কমছে, কারণ প্রতিটি মামলার অগ্রগত নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
‘জবাবদিহিতা সবার আগে’: বিচার বিভাগের নীতি
চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে অনেকে ভাবত আদালত মানেই দেরি, দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আদালত নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে নয়, বরং আইনের ভেতরে রেখেছে।
সি এম এম আদালতের বিচারকরা এখন নিয়মিতভাবে নিজেদের কাজের হিসাব দেন উচ্চ আদালতকে। বিচার কার্যক্রমে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব না পড়ার বিষয়ে আদালত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এতে করে সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছেন, আইনের চোখে সবাই সমান।
বিচার প্রার্থীর দৃষ্টিতে পরিবর্তন
রাজধানীর কেরানীগঞ্জ থেকে আসা এক ব্যবসায়ী বলেন, আগে আদালতে এলে ভয় লাগত-ফাইল হারিয়ে যাবে, শুনানি পিছিয়ে যাবে। এখন দেখি, নির্ধারিত সময়েই বিচার হয়। কেউ ঘুষ চায় না, সবাই কাজ করছে নিয়মমতো।
একজন নারী নির্যাতন মামলার বাদিনী জানান, বিচারক আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। সাক্ষ্য নেয়ার সময় আসামি পক্ষকেও সমান সুযোগ দেয়া হয়েছে। এমন নিরপেক্ষ বিচার আমি আগে দেখিনি।
এই পরিবর্তনই বোঝায়-বিচারের কাঠামো যখন জবাবদিহিতার মধ্যে থাকে, তখনই সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আদালত: ‘ই–বিচার’ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা
২০২৫ সালের আগস্ট থেকে সি এম এম আদালতে চালু হয়েছে ই-বিচার পাইলট প্রোগ্রাম। এতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হাজতি আসামিদের সাক্ষ্য গ্রহণ, অনলাইন কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও-রেজিস্টার চালু করা হয়।
প্রযুক্তির এই ব্যবহার শুধু সময় বাঁচাচ্ছে না, বরং মামলার স্বচ্ছতা ও প্রমাণ সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রাখছে। বিচারকদের রায় এখন ডিজিটালি আর্কাইভ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো সময় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
অপরাধীদের ছাড় নয়, আইনের কঠোর প্রয়োগ
সি এম এম আদালত সম্প্রতি কিছু আলোচিত মামলায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দুর্নীতি, প্রতারণা, মাদক ও সহিংস অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাবশালী অবস্থান বা পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। বিচারকেরা বারবার বলেছেন, অপরাধী যেই হোক, আইনের চোখে সবাই সমান।
এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক কয়েকটি রায়ে দেখা গেছে-
এসব রায়ের ফলে সাধারণ মানুষ আদালতের প্রতি নতুন করে আস্থা পাচ্ছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সরকারের ঊর্ধ্বে নয়, বরং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ
সি এম এম আদালতের কর্মকাণ্ডে বারবার উঠে আসছে একটি বার্তা, বিচার বিভাগ কারো অধীন নয়, তবে জবাবদিহিতার বাইরে নয়। এই দর্শনই আজকের বিচার ব্যবস্থাকে করেছে আরও মানবিক, আরও দায়িত্বশীল।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যখন বিচার বিভাগ নিজেই নিজের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, তখন ন্যায়বিচার আরও শক্ত ভিত্তি পায়। ঢাকার সি এম এম আদালতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই দিকেই এক বড় পদক্ষেপ।
যদিও উন্নতি স্পষ্ট, তবু কিছু চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে-
তবু আদালতের কর্মকর্তা ও বিচারকরা বিশ্বাস করেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে মামলার জট অনেকাংশে কমে যাবে।
ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এখন শুধু বিচার কার্যক্রমের কেন্দ্র নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থার প্রতীক। স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বচ্ছ প্রশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনা ও কঠোর জবাবদিহিতার এই সমন্বয় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
আজ আদালতের প্রতিটি রায়ে, প্রতিটি নির্দেশে প্রতিফলিত হচ্ছে একটি বার্তা, বিচার মানে শুধু শাস্তি নয়, এটি ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি।
জেএইচআর