রাজধানীতে টানটান উত্তেজনার মধ্যে সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঢোকার আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের আলোচিত মামলায় তার অবস্থান পরিষ্কার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল খালাস পাওয়ারই কথা।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, বিচার স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে। এ মামলায় শেখ হাসিনা এবং কামাল সাহেব খালাস পাবেন এটাই আমার প্রত্যাশা।
এই মন্তব্য যখন আসছে, তখন রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া অবস্থান, ট্রাইব্যুনালের আশপাশে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, এবং রায়কে ঘিরে হাজারো মানুষের দৃষ্টি আদালতের দিকে নিবদ্ধ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলার রায় সামনে রেখে রাজধানীতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অপ্রত্যাশিত কোনো পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতেই অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের নতুন সূচনা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নতুনভাবে গঠিত হয়। এরপর প্রথম যে অভিযোগটি ট্রাইব্যুনালে আসে, তা হলো-গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার হত্যাযজ্ঞে শেখ হাসিনার ভূমিকা সংক্রান্ত বিবিধ মামলা।
১৭ অক্টোবর ২০২৪: ট্রাইব্যুনালের প্রথম কার্যদিবসে হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা। প্রথম ধাপে তিনি ছিলেন একমাত্র আসামি।
১৬ মার্চ ২০২৫: সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়। ১ জুন ২০২৫: আনুষ্ঠানিক অভিযোগে প্রথমবারের মতো অন্তর্ভুক্ত হন তিনজন-হাসিনা, কামাল ও মামুন। মামুন পরবর্তী সময়ে দোষ স্বীকার করে অ্যাপ্রুভার হিসেবে বিবৃতি দেন।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয় ১২ মে, যার মোট পরিমাণ ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠা- যেখানে, তথ্যসূত্র: ২,০১৮ পৃষ্ঠা, জব্দতালিকা ও নথিপত্র: ৪,০০৫ পৃষ্ঠা, শহীদ তালিকার বিবরণ: ২,৭২৪ পৃষ্ঠা, ১০ জুলাই ২০২৫: তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ।
২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান তার যুক্তিতে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ দণ্ডের দাবি জানান। রাষ্ট্রপক্ষের সেই অবস্থান আরও জোরালো করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম।
এর সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্টেট ডিফেন্স আমির হোসেন বলেন, তারা অপরাধী নন, আদালত তাদের খালাস দেওয়া উচিত। ফলে রায় ঘোষণার আগেই আদালত চত্বরে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
উসকানিমূলক বক্তব্যের পর রাষ্ট্রব্যবস্থার শক্তি ব্যবহার করে হত্যাযজ্ঞ, ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনার কঠোর মন্তব্যের পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দলীয় সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতায়, দেশজুড়ে হামলা চালায়। গোলাগুলিতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের মতো আহত হন।
ড্রোন–হেলিকপ্টার ব্যবহারসহ প্রাণঘাতী অভিযান চালানোর নির্দেশ, তদন্তে উঠে এসেছে হাসিনা উচ্চপর্যায়ে প্রাণঘাতী অভিযান অনুমোদন করেন। ডাকসুর সাবেক ভিসি ও সাবেক মেয়রের সঙ্গে দুটি পৃথক অডিওতে মারণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করেন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে হত্যা, রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার দায়ে তিন আসামিকেই অভিযুক্ত করা হয়েছে।
চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা, রাজধানীর এই এলাকায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যে ছয়জনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে।
আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা, নিরীহ ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলার সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগগুলোর একটি। প্রসিকিউশনের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আগের সিদ্ধান্তের অংশ।
সব ঘটনার কেন্দ্রে এখন আদালত। স্টেট ডিফেন্সের খালাস প্রত্যাশা, প্রসিকিউশনের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি দুই অবস্থানই জনমনে নতুন উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ১৩ নভেম্বরের পর যে কোনো দিন রায় ঘোষণা হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই রায় নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করবে।
জেএইচআর