মানবতাবিরোধী অপরাধ: শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করল ট্রাইব্যুনাল 

আদালত প্রতিবেদক প্রকাশিত: নভেম্বর ১৭, ২০২৫, ০২:৫০ পিএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাবেক কোনো প্রধানমন্ত্রীকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ডের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সোমবার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে। 

একই মামলায় তার সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও একই সাজা দেওয়া হয়েছে। সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।

৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই পুরো রায় ঘোষণা করা হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারত যান এবং তখন থেকেই পলাতক হিসেবে বিবেচিত। পলাতক থাকায় রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগও তিনি পাচ্ছেন না বলে ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ট্রাইব্যুনালের বাইরে সকাল থেকেই ছিল সেনা, পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। দীর্ঘ সাড়ে চার হাজার পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার তিন বিচারক দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পাঠ করেন। এ সময় আদালতের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যসহ আইনজীবীরা। রায় ঘোষণা হতেই অনেকেই আবেগে কেঁদে ফেলেন, কেউ কেউ হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

তবে অ্যাটর্নি জেনারেল সবাইকে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনুরোধ করেন।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ অভিযোগগুলো পর্যালোচনায় সকলটিকেই প্রমাণিত বলে রায়ে উল্লেখ করেন। অভিযোগগুলো হলো, আন্দোলনের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় জনকে গুলি করে হত্যা ও আশুলিয়ায় ছয় জনকে পুড়িয়ে হত্যা।

ড্রোন দিয়ে অবস্থান শনাক্ত, হেলিকপ্টার থেকে গুলি বর্ষণসহ আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে শেখ হাসিনাকে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটির আওতায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

সাবেক আইজিপি মামুন নিজ দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হন। তার জবানবন্দিতে উঠে আসে ১৮ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মারণাস্ত্র ব্যবহারের আদেশ আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে। 

বিচারকরা বলেন, মামুন তদন্ত ও সাক্ষ্যে সহায়তা করায় তার শাস্তির মাত্রা কমানো হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি এটিকে ন্যায়বিচারের বিজয় বলে মন্তব্য করেছে। অন্যদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো আগে থেকেই রায়টিকে ‘প্রস্তুত করা’ আখ্যা দিলেও আদালত বাহিরে কোনো সংগঠিত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি স্থানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মিষ্টি বিতরণ ও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।

রায় ঘোষণার পর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে দেশবাসীকে উত্তেজনা পরিহার করে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

বিবৃতিতে বলা হয়, এ রায়কে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের সহিংসতা, ভাঙচুর বা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে।

এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তির আলোকে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর। ভারতকে সতর্ক করে বলা হয়েছে—দণ্ডিত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া ন্যায়বিচারের প্রতি অমর্যাদা।

রায় ঘোষণার আগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে এক্সকাভেটর নিয়ে যাওয়া একটি দলকে পুলিশ ও সেনাসদস্যরা বাধা দেয়। ১০ মাস আগে জ্বালিয়ে দেওয়া ভবনে তারা প্রবেশের চেষ্টা করলে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করা হয়।

সরকার বলেছে, এ ধরনের কোনো উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ড সহ্য করা হবে না।

বিচারের ৩৯৭ দিনের যাত্রা

  • ১৭ অক্টোবর ২০২৪: মামলা (মিসকেস) হিসেবে শুরু
  • ১৬ মার্চ ২০২৫: মামুনকে আসামি করে পুনর্গঠন
  • ১২ মে ২০২৫: তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল
  • ১ জুন ২০২৫: ফরমাল চার্জ
  • ১০ জুলাই ২০২৫: অভিযোগ গঠন
  • ৩ আগস্ট ২০২৫: বিচার শুরু
  • ৮ অক্টোবর ২০২৫: সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ
  • ২৩ অক্টোবর ২০২৫: যুক্তিতর্ক সমাপ্ত
  • ১৭ নভেম্বর ২০২৫: রায় ঘোষণা

পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম মামলার রায় হিসেবে এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সহিংসতা নিয়ে বহু মাসের তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও আইনি প্রক্রিয়ার পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোনো সাবেক রাজনৈতিক প্রধান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হলেন মানবতাবিরোধী অপরাধে।

এই রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হলেও সরকার কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।

ইএইচ