জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলককে এই মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এই পৃথক দুটি আবেদন দাখিল করেন।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুনজুর আলম শুনানিতে বিস্তারিত যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে বলেন, প্রসিকিউশন পক্ষ জয়ের ঠিকানা ও পরিচয় সঠিকভাবে উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছে। জয়ের ভূমিকার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয় ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ‘অবৈতনিক’ তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি কোনো মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন না এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গেও তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না।
আইনজীবী মুনজুর আলম বলেন, জয় কেবল প্রধানমন্ত্রীকে প্রয়োজনে পরামর্শ দিতেন, কিন্তু তিনি কোনো নির্বাহী আদেশ বা নির্দেশ দেওয়ার অবস্থানে ছিলেন না। নির্দেশ দেওয়ার একক দায়িত্ব ছিল সরকারের।
তিনি বলেন, পলকের ফেসবুক পোস্টগুলোর সঙ্গে জয়ের সম্পৃক্ততা নিয়ে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ নেই। পলক তাঁর পোস্টে জয়কে ট্যাগ করেননি এবং জয় সেগুলোতে কোনো লাইক বা কমেন্টও করেননি। ফলে এসব পোস্ট জয়ের জ্ঞাতসারে বা নির্দেশে হয়েছে বলাটা অযৌক্তিক।
তিনি আরও বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পুরো সময় জয় দেশের বাইরে ছিলেন। ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি কোনো প্রকাশ্য বক্তব্যও দেননি। প্রসিকিউশন উল্লেখ করেনি যে তিনি কখন দেশ ছেড়েছেন।
আইনজীবী দাবি করেন, জয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হওয়ার কারণেই তাকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে তার দেশে ফেরার পথ রুদ্ধ করা যায়।
অন্যদিকে, কারাগারে থাকা জুনাইদ আহ্মেদ পলকের পক্ষে আইনজীবী এম লিটন আহমেদ অব্যাহতির আবেদন করেন। আজ পলককে কড়া নিরাপত্তায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাঁর আইনজীবী দাবি করেন, পলক কোনো অপরাধ করেননি বরং তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।
আইনজীবী লিটন আহমেদ তাঁর যুক্তিতে বলেন, জুলাই মাসে ইন্টারনেট বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল কেবল ‘গুজব’ ছড়ানো রোধ করার জন্য, কোনো আন্দোলন দমনের জন্য নয়। এটি ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, প্রসিকিউশন পলকের বক্তব্যগুলো আংশিক বা ‘কাটছাঁট’ করে উপস্থাপন করেছে। পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য শুনলে বোঝা যাবে তিনি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার কথাই বলেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, পলকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ৯৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তিনি দীর্ঘ ৮৯ দিন রিমান্ডে ছিলেন। কারাগারেও তিনি যথাযথ আইনি পরামর্শ বা ‘প্রিভিলেজড কমিউনিকেশন’-এর সুযোগ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করা হয়।
প্রসিকিউশন পক্ষ ইতিমধ্যে জয় ও পলকসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের আবেদন করেছে। বর্তমান ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
আদালত উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ শেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, আগামী ২১ জানুয়ারি এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত আদেশ প্রদান করা হবে। বর্তমানে সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক থাকলেও পলক বিচারিক হেফাজতে রয়েছেন।
জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানি এবং সহস্রাধিক আহতের ঘটনায় এই ট্রাইব্যুনালে একের পর এক মামলা ও অভিযোগ জমা পড়ছে। জয় ও পলকের এই অব্যাহতির আবেদনের ওপর আদালতের সিদ্ধান্ত এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়।
এএন