পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীর অবৈধ সম্পদের পাহাড় এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের নেপথ্য কাহিনী উদ্ঘাটনে তাঁকে হেফাজতে নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ এই আদেশ দেন।
সরকারি কর্ম কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অভিযুক্ত সৈয়দ আবেদ আলীকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ ঢাকার আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। দুদকের দাবি, এই জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পিএসসির ভেতরে ও বাইরে থাকা এক বিশাল সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচন হতে পারে।
আদালত চত্বরের চিত্র ও শুনানি আজ সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আবেদ আলীকে কারাগার থেকে ঢাকা আদালত চত্বরে নিয়ে আসা হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁকে এজলাসে তোলা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তথা দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমিন সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন।
শুনানিতে দুদকের সরকারি কৌঁসুলি তরিকুল ইসলাম বলেন, আবেদ আলীর বৈধ আয়ের কোনো উৎসের সঙ্গে তাঁর বর্তমান সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। অনুসন্ধানকালে বিভিন্ন প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করলেও আদালত উভয় পক্ষের যুক্তি শুনে তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
রিমান্ড আবেদনের চাঞ্চল্যকর তথ্য দুদক সূত্রে জানা গেছে, আবেদ আলীর বিরুদ্ধে কেবল দুর্নীতি নয়, বরং অর্থ পাচার এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ব্যবস্থার গোপনীয়তা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে দুদক উল্লেখ করেছে, আবেদ আলীর ব্যাংক হিসেবে কোটি কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন দেখা গেছে। এর মধ্যে মো. জাকারিয়া রহমানসহ একাধিক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে, যা গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর এই চক্রের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিরা অনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে চাকরি পেয়েছেন। পিএসসির একজন সাধারণ গাড়িচালক হয়েও তিনি কীভাবে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুললেন এবং কার আশ্রয়ে এই সাম্রাজ্য বিস্তার করলেন, তা তদন্তের মূল বিষয়।
সম্পদের পাহাড় ও দুদকের অনুসন্ধান প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবেদ আলীর নামে ও বেনামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, জমি এবং ব্যাংকিং সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর জীবনযাপনের আভিজাত্য এবং মফস্বলে গড়ে তোলা অট্টালিকার ছবি প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দুদক মনে করছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাঁর বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য এবং দুর্নীতির অংশীদারদের নাম বেরিয়ে আসবে।
আগামী দিনের তদন্তের গতিমুখ আইনজীবীরা মনে করছেন, তিন দিনের এই রিমান্ডের ফলে পিএসসির মতো একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ বছর ধরে চলা অনিয়মের শেকড় কতদূর বিস্তৃত, তা জানা সম্ভব হবে। আবেদ আলীর সাথে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকায় আরও বড় কোনো নাম আসে কি না, সেদিকেই এখন সবার নজর।
দুদকের সরকারি কৌঁসুলি তরিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত এবং মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উপাত্ত উদ্ধারের জন্য আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন। আমরা আশা করছি, এই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির একটি বড় বলয় ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে। শুনানি শেষে বিকেলে আবেদ আলীকে আদালত থেকে পুনরায় পুলিশি পাহারায় নিয়ে যাওয়া হয়। আগামী কয়েক দিন দুদক কার্যালয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
জেএইচআর