জিয়াউল আহসানের বিচার

দ্বিতীয় দিনে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিচ্ছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক  প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬, ০১:৫২ পিএম

সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক ও মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ১০৪ জন গুম-খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো সাক্ষ্য দিচ্ছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

রোববার মামলার প্রধান সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দি দেওয়া শুরু হয়। প্রথম দিনের সাক্ষ্যে তিনি সেনাবাহিনীতে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মানসিকতা তৈরির ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেন।

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে সৃষ্ট ‘ডিপ স্টেট’ বা ছায়া সরকারের কার্যক্রম নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। 

তিনি ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সে সময় সেনা সদস্যদের ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া ছিল মূলত ‘হত্যার লাইসেন্স’ প্রদানের নামান্তর। সেখান থেকেই বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের মানসিকতা বাড়তে থাকে।

সাবেক ডিআইজি বেনজীর আহমেদ র‍্যাব মহাপরিচালক এবং জিয়াউল আহসান এডিজি থাকাকালীন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় বলে তিনি দাবি করেন। তিনি উল্লেখ করেন, র‍্যাবে পুলিশের পাশাপাশি সেনা সদস্যদের যুক্ত করা ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত।

২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষের যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল, তাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে নানা দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় প্রজেক্টে সেনা সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে একটি ‘ডিপ স্টেট’ তৈরি করেছিলেন এবং সেখান থেকেই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী ও গোপনীয় সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হতো বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান সাবেক এই সেনাপ্রধান।

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে গুম এবং পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে হত্যার তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। 

প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী গুম ও হত্যার মাধ্যমে ১০৪ জন ব্যক্তিকে ভুক্তভোগী করা। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে ডিজিটাল নজরদারি বা এনটিএমসি-কে ব্যবহার। জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করে দিয়ে গণহত্যায় সহায়তা।

চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জিয়াউল আহসানকে ‘বাংলার কসাই’ হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন জানিয়েছেন।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এই মামলার শুনানি পরিচালনা করছেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আজকের সাক্ষ্যগ্রহণে গুম কমিশনের প্রতিবেদন ও আরও কিছু গোপন নথিপত্র সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।

সাবেক কোনো সেনাপ্রধানের এভাবে ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দেওয়া দেশের বিচার বিভাগীয় ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গুম ও খুনের সাথে জড়িত মাস্টারমাইন্ডদের প্রকৃত পরিচয় এবং তাদের কর্মকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত হবে।

এএন