জঙ্গি সাজিয়ে ৯ তরুণ হত্যা

হাসিনা-কামালসহ ৬ জনকে আত্মসমর্পণে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম

রাজধানীর মিরপুরের জাহাজবাড়িতে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে নয় তরুণকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নতুন আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক ছয় আসামিকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৮ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে।

রোববার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার–এর নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আদালত বলেন, যেহেতু কয়েকজন আসামি এখনো গ্রেপ্তার হননি এবং আদালতে হাজির হননি, তাই আইনানুগ প্রক্রিয়ায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে তাঁদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দিতে হবে।

এদিন রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ও আবদুস সাত্তার পালোয়ান। তাঁরা আদালতকে জানান, মামলার আট আসামির মধ্যে দুজন বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় আছেন, বাকিরা পলাতক। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আইন অনুযায়ী গণবিজ্ঞপ্তি প্রয়োজন।

মামলায় মোট আসামি আটজন। গ্রেপ্তার হওয়া দুজন হলেন সাবেক আইজিপি একে এম শহিদুল হক এবং ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া। তাঁরা বর্তমানে হেফাজতে রয়েছেন।

পলাতক ছয়জনের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তৎকালীন প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায় এবং তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, এসব আসামির বিরুদ্ধে নির্ধারিত জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে তাঁদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে হবে।

এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন। একইসঙ্গে আটজনের বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের কল্যাণপুর অভিযানে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে পরিকল্পিতভাবে নয় তরুণকে হত্যা করা হয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

ঘটনার পটভূমি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাতে রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকায় জাহাজবাড়ি নামে পরিচিত একটি ভবনে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। ‘অপারেশন স্ট্রম-২৬’ নামে পরিচালিত ওই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করে, সেখানে জঙ্গিদের আস্তানা ছিল এবং বন্দুকযুদ্ধে নয়জন নিহত হন। তবে দীর্ঘদিন ধরেই নিহতদের পরিবার এবং মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশ অভিযোগ করে আসছিলেন, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যা এবং ঘটনাটিকে জঙ্গিবিরোধী অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বর্তমান মামলায় প্রসিকিউশনের দাবি, ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা এ বিষয়ে অবগত ছিলেন। মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযানের নামে আটক ব্যক্তিদের জীবিত গ্রেপ্তার না করে গুলি করে হত্যা করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাটিকে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার করে প্রকৃত সত্য গোপন করার চেষ্টা করা হয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও যদি আসামিরা হাজির না হন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে অনুপস্থিতিতে বিচার (trial in absentia) শুরুর বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলোতে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া ন্যায়বিচারের স্বার্থেই প্রয়োজন। একইসঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও আদালতের দায়িত্ব।

এই মামলার রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার নাম আসামির তালিকায় থাকায় বিষয়টি দেশ-বিদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।

আদালতের নির্ধারিত ৮ মার্চের শুনানিতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অগ্রগতি, গ্রেপ্তার আসামিদের অবস্থা এবং প্রসিকিউশনের পরবর্তী প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিচারকরা এদিন মামলার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করতে পারেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশ বলছে, বহু বছর ধরে আলোচিত কল্যাণপুর ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে তারা জোর দিচ্ছে, বিচার যেন নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে হয়। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্টদের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তাঁদের মক্কেলরা নির্দোষ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়নি।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মূলত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত। সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অভিযানে সংঘটিত ঘটনাও এ আইনের আওতায় আসতে পারে কি না, তা নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বর্তমান মামলাটি সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

সব মিলিয়ে কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ি অভিযান নিয়ে দায়ের করা এ মামলা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ এবং পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণের মধ্য দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে চলেছে। এখন দেখার বিষয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আসামিরা আদালতে হাজির হন কি না এবং মামলার শুনানিতে কী ধরনের নতুন তথ্য উঠে আসে।

এএন