যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) এবং বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এই আদেশ প্রদান করেন।
রাজধানীর গুলশানে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি দামি ফ্ল্যাট অবৈধভাবে দখলের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন আদেশের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের সহকারী পরিচালক এ কে এম মর্তুজা আলী সাগরের পক্ষ থেকে আদালতে পেশ করা আবেদনে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার: আবেদনে বলা হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে টিউলিপ সিদ্দিক রাজউকের (RAJUK) আইন কর্মকর্তাদের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করেন।
তিনি কোনো অর্থ পরিশোধ ছাড়াই গুলশান-২ এলাকার ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের একটি ফ্ল্যাট (ফ্ল্যাট নং বি/২০১, বাড়ি নং ৫এ ও ৫বি) নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন।
দুদক আদালতকে জানিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট মামলা দায়েরের আগেই টিউলিপ সিদ্দিক দেশত্যাগ করেছেন এবং বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করে মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
দুদকের দাবি, যেহেতু আসামি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, তাই তাঁকে আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
এটিই টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে প্রথম কোনো আইনি ব্যবস্থা নয়। ২০২৬ সালের এই রেড নোটিশ জারির আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।
উল্লেখ্য যে, এর আগে ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্লট বরাদ্দে জালিয়াতির পৃথক একটি মামলায় টিউলিপ সিদ্দিককে তাঁর অনুপস্থিতিতে (In absentia) দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছিলেন বাংলাদেশের একটি আদালত। সেই সময় টিউলিপ সিদ্দিক লন্ডনে অবস্থানকালে এসব অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
টিউলিপ সিদ্দিক বর্তমানে উত্তর লন্ডনের হ্যামস্টেড এবং হাইগেট আসনের লেবার পার্টির এমপি। বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে সাজা এবং তদন্ত চলাকালে জানুয়ারি ২০২৬-এ তিনি যুক্তরাজ্যের ট্রেজারি মিনিস্টারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। যদিও তিনি দাবি করে আসছেন যে, তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার, তবে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির এই আদেশ তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে নতুন করে সংকটে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
আদালতের এই আদেশের ফলে এখন পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে ইন্টারপোল সচিবালয়ে আবেদন পাঠানো হবে। ইন্টারপোল যদি এই আবেদনটি গ্রহণ করে রেড নোটিশ ইস্যু করে, তবে বিশ্বব্যাপী ১৯৫টি সদস্য দেশের বিমানবন্দরে টিউলিপ সিদ্দিকের যাতায়াতের ওপর কড়া নজরদারি থাকবে এবং তাত্ত্বিকভাবে যে কোনো দেশ তাঁকে আটক করে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে এই রেড নোটিশ জারির আদেশ তারই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যুক্তরাজ্যের সাথে বাংলাদেশের কোনো সরাসরি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায়, তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে আইনি মহলে বিতর্ক রয়েছে।
এএন