বিচারের অন্তিম লগ্নে জাতি

আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ৯ এপ্রিল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৬, ১২:০০ পিএম

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ ও প্রভাবশালী হত্যাকাণ্ড শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) গেটে পুলিশের গুলিতে বুক পেতে দেওয়া সেই অকুতোভয় তরুণ আবু সাঈদকে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৯ এপ্রিল, ২০২৬ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক মামলার রায় প্রদান করবেন।

বৃহস্পতিবার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক বেঞ্চ এই দিনটি নির্ধারণ করেন। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আইনি যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলাটিকে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (CAV) রেখেছিলেন, যা আজ চূড়ান্ত হলো।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার সেই দুহাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেওয়ার দৃশ্যটি পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে এক অবিস্মরণীয় গতি প্রদান করেছিল। পরবর্তীতে এই ঘটনাকে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে গণ্য করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়।

এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। গত বছরের ৩০ জুন ট্রাইব্যুনাল মামলার ৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে তা আমলে নেন। এরপর বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ ও তদন্ত কর্মকর্তার পক্ষে মোট ২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। মামলাটিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর শীর্ষ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। আইনজীবীদের মতে, তার দেওয়া সাক্ষ্য মামলার গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

এই মামলায় অভিযুক্ত ৩০ জন আসামির মধ্যে অর্ধেকের বেশি পলাতক থাকলেও ৬ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। অভিযুক্তদের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পুলিশ সদস্য এবং ছাত্রসংগঠনের নেতাও রয়েছেন।

বর্তমানে এই মামলায় কয়েকজন ব্যক্তি কারাগারে আছেন। তারা হলেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল এবং রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ। এছাড়া পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ও কারাগারে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশও এই মামলায় আটক অবস্থায় আছেন।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য (ভিসি) হাসিবুর রশীদসহ আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হিসেবে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া এবং সরাসরি হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

জুলাই আন্দোলনের হাজারো শহীদের মধ্যে আবু সাঈদের মৃত্যুটি ছিল একটি প্রতীকী মোড়। কোনো আড়াল ছাড়া, নিরস্ত্র অবস্থায় পুলিশের রাইফেলের সামনে বুক পেতে দেওয়া বীরত্ব কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলও তাদের পর্যবেক্ষণে এই সাহসিকতা এবং পুলিশের সেই 'পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ' থেকে গুলি করার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন।

আইনজীবীদের মতে, এই রায়টি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। বিশেষ করে সরকারি বাহিনীর হাতে সাধারণ নাগরিক হত্যার ক্ষেত্রে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে ট্রাইব্যুনালের এই বিচারিক প্রক্রিয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদাহরণ তৈরি করবে।

আবু সাঈদের পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানানো হচ্ছিল। রায়ের তারিখ ঘোষণার পর তাদের কণ্ঠে স্বস্তির আভাস পাওয়া গেছে। তারা চান, যারা সরাসরি ট্রিগার চেপেছে এবং যারা নেপথ্য থেকে নির্দেশ দিয়েছে, তাদের সবারই যেন সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হয়।

আজকের আদেশের সময় ট্রাইব্যুনাল চত্বরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। বিচারক প্যানেল মামলার স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে এবং জনস্বার্থ মাথায় রেখে দ্রুততম সময়ে রায় প্রদানের সদিচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। ৯ এপ্রিল রায় ঘোষণার দিন আদালত প্রাঙ্গণে জনসাধারণের ভিড় এড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জুলাই বিপ্লবের প্রথম সারির শহীদ আবু সাঈদের রক্তের ঋণ শোধ হবে কি না, তা জানার জন্য পুরো জাতি এখন ৯ এপ্রিলের দিকে তাকিয়ে আছে। এটি কেবল একটি হত্যা মামলার রায় নয়, বরং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহিতার একটি অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এএন