আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

সাবেক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকার জামিন বাণিজ্যের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ১০, ২০২৬, ১২:২১ পিএম

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের অন্যতম সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগের বিচার হয়, সেখানে রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবীর বিরুদ্ধে আসামিকে জামিন পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে। 

অভিযুক্ত ব্যক্তি আর কেউ নন, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ কেবল বিচার ব্যবস্থার ওপর আঘাত নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নগ্ন দলিল হিসেবে সামনে এসেছে।

২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলকালে পরিবারের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে এই যোগাযোগের সূত্রপাত।

হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের একাধিক রেকর্ডিং পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাইমুম রেজা তালুকদার ফজলে করিমের পরিবারকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, অর্থের বিনিময়ে তিনি কেবল জামিনই নয়, বরং তদন্ত প্রতিবেদনের গোপন অনুলিপিও সরবরাহ করতে পারবেন। একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে তাকে স্পষ্টভাবে বলতে শোনা যায়, 'আলটিমেটলি যদি ওনাকে বের করা যায়, তবে ওয়ান ক্রোরের (১ কোটি টাকা) একটি বিষয় থাকবে।'  

ঘুষের এই দর কষাকষিতে সাইমুম রেজা তালুকদার বেশ কৌশলী ছিলেন। তিনি ১ কোটি টাকাকে এককালীন না চেয়ে কিস্তিতে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে তার শর্ত ছিল, কাজ শুরুর আগে অন্তত ১০ লাখ টাকা নগদে (In Cash) দিতে হবে। তিনি পরিবারটিকে বলেন, 'যদি ১০ লাখের মতো অগ্রিম দেওয়া যায়, তাহলে খুব ভালো হয় নগদে।' এমনকি আদালতের বারান্দায় বা হাইকোর্ট এলাকায় লোকচক্ষুর অন্তরালে টাকা লেনদেনের বিষয়েও তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন যাতে কারো মনে কোনো সন্দেহ তৈরি না হয়।

সাইমুম রেজা কেবল নিজের পকেট ভারি করার চেষ্টাই করেননি, বরং পুরো প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ তথ্য পাচার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি ফজলে করিমের পরিবারকে জানিয়েছিলেন যে, তদন্তকারীরা পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, পুলিশ ও তদন্ত সংস্থা তাকে 'ফাঁসাতে' চাইছে। এমনকি তিনি আইসিটির একজন তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন এবং তাকে ম্যানেজ করার জন্য পরিবারকে টাকা দেওয়ার পরামর্শ দেন।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদেও পরিবর্তন আসে। তাজুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হন বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। এই পরিবর্তনের সুযোগ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন সাইমুম রেজা। 

তিনি পরিবারটিকে কল করে বলেন, 'আমি আবার এই মামলাতে ইন করব। বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর বিএনপিপন্থী, ইনশাআল্লাহ আমার প্রভাব আরও বাড়বে।'

তিনি দাবি করেন, নতুন নেতৃত্বের অধীনে তিনি মামলাটি এমনভাবে সাজাবেন যেন জামিন পাওয়া সহজ হয়। তার এই আত্মবিশ্বাস প্রমাণ করে যে, তিনি বিচারিক প্রক্রিয়াকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে কতটা বেপরোয়া ছিলেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবার শুরু থেকেই সাইমুম রেজার এই প্রস্তাবগুলোকে 'ফাঁদ' হিসেবে ব্যবহার করেছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা কখনোই টাকা দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেননি। বরং প্রসিকিউটরের দুর্নীতির প্রমাণ হাতেনাতে সংগ্রহ করার জন্য তারা যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। প্রায় ২৬ বার ফোনালাপ এবং ১৪ বার ঘুষ দাবির যাবতীয় তথ্য তারা রেকর্ড করে রাখেন।

তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি সাইমুম রেজাকে নির্দিষ্ট ওই মামলা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তবে তাকে পুরোপুরি প্রসিকিউশন থেকে বরখাস্ত করা হয়নি। 

তাজুল ইসলামের দাবি, পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণ (যেমন অডিওর কপি) তার হাতে না থাকায় তিনি চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে পারেননি। তিনি মনে করেন, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ছাড়া তার পক্ষে কাউকে অপসারণ করা সম্ভব ছিল না।

ঘটনাটি চরম মোড় নেয় যখন ফজলে করিমের পরিবার অডিও রেকর্ডগুলো সরাসরি বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের হাতে তুলে দেন। এরপরই মন্ত্রী অভিযুক্ত সাইমুম রেজাকে ফোন করে গ্রেপ্তারের হুমকি দেন বলে জানা যায়। এক রেকর্ডিংয়ে সাইমুম রেজাকে আতঙ্কিত কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, “মন্ত্রী আমাকে ফোন করে বলতেছে আমাকে পুলিশে দিবে। আপনি কি আমাকে একটু হেল্প করতে পারবেন?'

তবে প্রকাশ্যে সাইমুম রেজা এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। কোনো ধরণের অর্থ লেনদেনের প্রস্তাব তিনি দেননি এবং তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

একজন প্রসিকিউটর যখন আসামিপক্ষের সাথে রফাদফা করতে বসেন, তখন বিচার বিভাগের পবিত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সাইমুম রেজা তালুকদার পেশায় একজন শিক্ষক হয়েও যেভাবে 'টাকা দিলে মুক্তি'র নিশ্চয়তা দিচ্ছিলেন, তা সাধারণ মানুষের বিচারালয়ের প্রতি আস্থাকে চরমভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও বেশি যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা কম থাকা সত্ত্বেও কেবল 'নাগরিক সমাজের পরিচিত মুখ' হওয়া কোনো প্রসিকিউটরের যোগ্যতা হতে পারে না।

ইতিমধ্যেই সাইমুম রেজা তালুকদার পদত্যাগ করেছেন। তবে কেবল পদত্যাগই কি যথেষ্ট? একজন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর এই ধরণের জঘন্য নৈতিক স্খলনের বিচার কি হবে না? আইন মন্ত্রণালয় এবং ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সাথে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

এই ঘটনা একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে যে, প্রযুক্তির এই যুগে ক্ষমতার আড়ালে বসে দুর্নীতি করা এখন আর সহজ নয়। পকেট ভর্তি টাকা আর প্রভাবের মোহে অন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শেষ পরিণতি যে কাঠগড়া সাইমুম রেজার এই পতন তারই জলন্ত উদাহরণ।

এএন