আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যেখানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার আইনি প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে এক বিশাল নৈতিক ধসের ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সদ্য পদত্যাগী প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠার পর কেবল ব্যক্তিগত শাস্তি নয়, বরং পুরো ট্রাইব্যুনালের অতীতের কার্যক্রম নিয়ে এক নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযানের ঘোষণা এসেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম এক জরুরি ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ট্রাইব্যুনালের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। অতীতের সকল কার্যক্রম এখন থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাইবাছাই করা হবে।’
অভিযোগ ওঠার পরপরই দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়। সাইমুম রেজা তালুকদার যেসকল সংবেদনশীল মামলা ও নথিপত্র নিয়ে কাজ করতেন, সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে নিজ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। মূলত এই নথিপত্রগুলো ব্যবহার করে তিনি অন্য কোনো আসামির সাথে লিয়াজোঁ করেছিলেন কি না বা বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার চেষ্টা করেছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম একটি যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, শুধু সাইমুমের মামলাই নয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে যতগুলো মামলার শুনানি বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার সবকটিই এখন বিশেষ নিরীক্ষার আওতায় আনা হবে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এমন একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়তে চাই যেখানে প্রতিটি অভিযোগের বিচার হবে নিরপেক্ষভাবে। এই ঘটনাটি বিচার ব্যবস্থাকে কেবল প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, বরং আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। এই কলঙ্ক মুছতে আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করছি এবং অতীতের প্রতিটি কার্যক্রম যাচাই করে দেখব সেখানে কোনো অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি ছিল কি না।’
পুরো ঘটনার সূত্রপাত জুলাই হত্যাকাণ্ডের একটি মামলাকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে মামলার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে তাঁর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেন সাইমুম রেজা। সম্প্রতি সেই লেনদেনের কথোপকথন সম্বলিত ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর তোলপাড় শুরু হয়।
এই ফোনালাপের সত্যতা পাওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের সব প্রসিকিউটরদের নিয়ে আজ জরুরি বৈঠকে বসেন চিফ প্রসিকিউটর। বৈঠকে সাইমুমের এই কর্মকাণ্ডকে ‘প্রতিষ্ঠানের পিঠে ছুরি মারা ‘হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে সাধারণ মানুষের যে আবেগ ও প্রত্যাশা রয়েছে, এই ঘটনা সেখানে একটি কালো মেঘের ছায়া ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সাইমুমের মতো ব্যক্তির এই অপকর্ম পুরো বিচারিক প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতাকে আন্তর্জাতিক মহলে খাটো করতে পারে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। বিচার ব্যবস্থাকে পণ্য করার অধিকার কারো নেই। আমরা তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করে কঠোর ব্যবস্থা নেব, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন দুঃসাহস না দেখায়।’
বিচারের বাণী যেন নিভৃতে না কাঁদে সেই লক্ষ্যেই এখন থেকে ট্রাইব্যুনাল কঠোর অবস্থানে। সাইমুম রেজা তালুকদারের পদত্যাগ কেবল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং এটি ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা সম্ভাব্য দুর্নীতিবাজদের জন্য এক সতর্কবার্তা।
এএন