২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক অবিনাশী নাম আবু সাঈদ। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী শিক্ষার্থীর বুক চিতিয়ে পুলিশের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্যটি ছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার অন্যতম অনুঘটক।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে ৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন।
ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে আসামিদের তিনটি প্রধান স্তরে ভাগ করে সাজা প্রদান করেছেন। রায়ে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মোট ৩০ জন আসামির মধ্যে দুই পুলিশ সদস্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, আর বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ভিসি, প্রক্টর, শিক্ষক, ছাত্রলীগ নেতা এবং পুলিশ কর্মকর্তা।
আবু সাঈদকে সরাসরি লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং সেই ঘটনার নির্দেশদাতাদের মধ্যে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কঠোর সাজা দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই পুলিশ সদস্য
ঘটনার দিন সরাসরি গুলি চালানোর দায়ে সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, নিরপরাধ ও নিরস্ত্র এক শিক্ষার্থীর ওপর সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার পেশাদারিত্বের চরম লঙ্ঘন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে উসকানি ও তদারকির দায়ে পুলিশের তিন সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন- সাবেক সহকারী কমিশনার (এসি) মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম, সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) বিভূতিভূষণ রায়।
উল্লেখ্য, এই তিনজনই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। ট্রাইব্যুনাল তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় ব্যর্থতার জন্য কঠোর সাজা প্রদান করেছেন।
উপাচার্য ও শিক্ষকদের সাজা
সাবেক ভিসি মো. হাসিবুর রশীদকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পলাতক এই উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে চরম অবহেলা ও পুলিশি অ্যাকশন উসকে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডলকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রক্টর ও কর্মকর্তা-কর্মচারী
সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন। অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেলকে ৫ বছর এবং মো. হাফিজুর রহমানসহ আরও কয়েকজনকে ৩ বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
ছাত্রলীগ নেতাদের দণ্ড
আন্দোলনের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের দণ্ড দেওয়া হয়েছে। বেরোবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসানকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক মো. মাহাফুজুর রহমান, সহসভাপতি মো. ফজলে রাব্বি ও আখতার হোসেনসহ বাকি ছয়জন ছাত্রলীগকে ৩ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। তারা সবাই বর্তমানে পলাতক।
পুলিশ কমিশনার ও অন্যান্যদের দণ্ড
রংপুর মহানগর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও আদালত নমনীয়তা দেখাননি। সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সাবেক ডিসি ও এডিসি মো. আবু মারুফ হোসেন এবং শাহ নূর আলম পাটোয়ারীকে ৫ বছর করে সাজা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ময়নাতদন্ত বা চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য গোপন বা কারচুপির অভিযোগে পলাতক চিকিৎসক মো. সরোয়ার হোসেনকে (চন্দন) ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই মামলায় একমাত্র ব্যতিক্রমী রায় দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজের ক্ষেত্রে। আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করলেও তার দীর্ঘ হাজতবাস বিবেচনা করে সাজা পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করেন। অন্য কোনো মামলায় গ্রেফতার না থাকলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী তার রায়ে উল্লেখ করেন, আবু সাঈদ শুধু একজন শিক্ষার্থী ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের প্রতীক। তার হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ প্রমাণ করে যে, পুলিশ কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই তাকে গুলি করেছে। এই রায় বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রযন্ত্রের যে কোনো বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত এই রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে আবু সাঈদের পরিবারের সদস্য এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যদিও অধিকাংশ আসামি পলাতক, তবে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকরের দাবি জানিয়েছে সচেতন নাগরিক সমাজ।
এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, জনগণের ওপর রাষ্ট্রের অন্যায্য বলপ্রয়োগের বিচার একদিন না একদিন নিশ্চিত হয়। আবু সাঈদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সত্য আজ আদালতের কাঠগড়ায় প্রতিষ্ঠিত হলো।
এএন