সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের আইনি লড়াইয়ে আজ একটি বড় মোড় এসেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ড এবং রায় জালিয়াতির মতো গুরুতর অভিযোগে দায়ের করা পৃথক পাঁচ মামলায় উচ্চ আদালতের দেওয়া জামিন বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন দেশের সর্বোচ্চ আদালত আজ মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে এই আদেশ প্রদান করেন। তবে আইনি মারপ্যাঁচে এখনই তাঁর কারামুক্তি ঘটছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
গত ৮ মার্চ উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) সাবেক এই প্রধান বিচারপতিকে চারটি মামলায় জামিন দিয়েছিলেন। এই মামলাগুলোর মধ্যে ছিল যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী হত্যা মামলা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক রায় জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের করা মামলা। এর মাত্র তিন দিন পর ১১ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি পৃথক মামলায়ও তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষ এই জামিন আদেশের বিরোধিতা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন জানায়। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ছিল, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁর জামিন স্থগিত হওয়া প্রয়োজন। গত ৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত বিষয়টি নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য ২৬ এপ্রিল তারিখ নির্ধারণ করেন। আজ সেই শুনানির ধারাবাহিকতায় আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন ও লিভ টু আপিল খারিজ করে দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে অংশ নেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা। অন্যদিকে খায়রুল হকের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী ও মোতাহার হোসেন সাজু।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা বেশ দীর্ঘ। গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক গ্রেপ্তারের পর তাঁকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
রায় জালিয়াতির অভিযোগ: ২০১১ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) বাতিল সংক্রান্ত রায়ের মূল কপির সাথে জালিয়াতির অভিযোগ এনে গত বছরের আগস্ট মাসে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন। একই অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়।
দুদকের মামলা: ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজউকের প্লট গ্রহণ ও বিধিবহির্ভূত আর্থিক সুবিধার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
আজকের আদেশের পর খায়রুল হকের আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানান, পাঁচ মামলায় জামিন বহাল থাকায় আইনগতভাবে তাঁর মুক্তিতে বাধা থাকার কথা নয়। তবে আইনি পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক ভিন্ন তথ্য। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, গত ৩০ মার্চ যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানার পৃথক আরও দুটি হত্যা মামলায় তাঁকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ফলে হাইকোর্ট থেকে পাওয়া এই পাঁচ মামলার জামিন বহাল থাকলেও, ওই নতুন দুই মামলায় জামিন না পাওয়া পর্যন্ত তিনি কারাগার থেকে বের হতে পারছেন না।
এ বি এম খায়রুল হক ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হলো ২০১১ সালের ১০ মে দেওয়া ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়।
এই রায়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছিল, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশাল মেরুকরণ সৃষ্টি করে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তাঁর সেই রায় এবং বিচারিক আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে এবং তিনি আইনি বেড়াজালে আটকা পড়েন।
আদালত পাড়ার পর্যবেক্ষণ: আজকের এই আদেশের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, বিচার বিভাগ তার নিজস্ব গতিতে আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। তবে সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে হত্যা ও জালিয়াতির মতো অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া যে আরও দীর্ঘ হবে, তা অনেকটা নিশ্চিত। এখন দেখার বিষয়, নতুন দুই মামলায় জামিন আবেদন নিয়ে তাঁর আইনজীবীরা পরবর্তী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
আইনজীবীদের মতে, কারামুক্তির জন্য এখন তাঁর সামনে একমাত্র পথ হলো নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো মামলাগুলোতে উচ্চ আদালত থেকে জামিন সংগ্রহ করা। অন্যথায়, আজ জামিন বহাল হওয়ার স্বস্তি কেবল আইনি নথিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এএন