এক: সে অনেক দিন আগের কথা। তখন মাত্র কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখব বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটের কিছু নথিপত্র তুলে কেরানীগঞ্জ যাচ্ছিলাম। যেভাবেই হোক ওই গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পথিমধ্যে হারিয়ে গেল। পাশেই ছিল কোতোয়ালি থানা। সেখানেই সাধারণ ডায়েরি করতে গেলাম। এক তরুণ, স্মার্ট সাব-ইনস্পেক্টর ডেকে নিলেন। কী করতে চাই, জেনে নিয়ে আশ্বস্ত করলেন, সব হবে, চিন্তার কিছু নেই। বললেন, “একটু বসুন, আমি সবকিছু প্রস্তুত করে দিচ্ছি।”
দুই: তরুণ ওই পুলিশ অফিসার নিজেই সাধারণ ডায়েরি করতে সহায়তা করলেন। কীভাবে এটা পুনরুদ্ধার করা যাবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দিলেন। সাধারণ ডায়েরি লেখা শেষে বললেন, মূল কপিটির আরও একটি ফটোকপি করে নিয়ে আসুন, দেখি কী করা যায়। আমি ওয়ালেট বের করলাম। দেখলাম, মানিব্যাগের এক কোণে মাত্র পাঁচ টাকার একটি কয়েন অবশিষ্ট আছে। মনে মনে ভাবলাম, এখন কেরানীগঞ্জ আলমঘাট যেতে নৌকা ভাড়া পাঁচ টাকা (এখন হয়তো দশ বা বিশ টাকা)। এটা তো লাগবেই। নদী পার হয়ে চুনকুটিয়া পর্যন্ত ৪০ টাকা রিকশাভাড়া। হেঁটে গেলেও নদীতে তো হেঁটে পার হওয়া যায় না। ভীষণ বিপাকে পড়ে চুপ করে রইলাম। বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী করব। পাঁচ টাকা থেকে দুই টাকা ব্যয় করে ফটোকপি করলেও অবশিষ্ট তিন টাকা নিয়ে একই সমস্যায় পড়তে হবে। এদিকে ফোনেও ব্যালেন্স নেই। কাউকে কল দিয়ে টাকা পাঠাতে বলারও উপায় নেই। অগত্যা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে? আর কোনো সমস্যা?” আমি চুপচাপ। পরে বললাম, ফটোকপি লাগবে না; আসলে আমার কাছে টাকা শেষ। তিনি অবাক হলেন। পাঁচ টাকাও হাতে নেই। এ কথা বলতে গিয়েও আমি খানিকটা ধাক্কা খেলাম; লজ্জিতও হলাম।
তিন: এর পরের ঘটনাটি ছিল আরও কাকতালীয়। ভদ্রলোক আমাকে বাইরে নিয়ে গেলেন। কয়েকটি ফটোকপি করে নিজের কাছে একটি রাখলেন। বললেন, সমস্যা সমাধান হবে, চিন্তার কিছু নেই। এরপর বললেন, “আপনি হয়তো দুপুরে কিছু খাননি। চলুন, দুই ভাই একসঙ্গে লাঞ্চ করি।” আমি অবাক হলাম। লাঞ্চ করলাম না, তবে তিনি আমাকে জোর করে ভারী নাশতা করালেন। হাতে দুশো টাকা দিয়ে বললেন, “নৌকা ভাড়া দেবেন, আর নদী পার হয়ে রিকশায় বাড়ি যাবেন।” আমি বললাম—আমার বাসায় যেতে বড়জোর পঞ্চাশ টাকা লাগবে (রিকশাভাড়ার তারতম্যের কারণে)। ফলে পঞ্চাশ টাকা হলেই চলবে। তিনি শুনলেন না। ১০০ টাকা নিতে আমাকে বাধ্য করলেন।
আমি রীতিমতো অবাক। আমাকে চেনেন না। কখনো দেখাও হয়নি। তবুও পাশে দাঁড়ালেন। ভাবলাম, এমন মানুষ হয়? তা-ও একজন পুলিশ সদস্য? বিশ্বাস হচ্ছিল না। তবে মনে এই বিশ্বাস জন্মাল: “এমন মানুষগুলোর জন্যই পৃথিবী সুন্দর। খুব সুন্দর।” পুরো সময়টা তিনি আপন ভাইয়ের মতো স্নেহ দিলেন। সে যাত্রায় আমি অল্পতেই রেহাই পেয়েছিলাম।
চার: এরপর থেকে প্রায়ই ভাইয়ের সঙ্গে কথা হতো। কখনও দেখা করতাম। আমাদের গল্প হতো, নানা কিছু নিয়ে, সুখ, দুঃখবোধ আর যাপিত জীবনের সমীকরণ নিয়ে। বলছিলাম কোতোয়ালি থানার তৎকালীন সেই স্মার্ট সাব-ইনস্পেক্টর শাহাদাত হোসেনের কথা।
ভাই অনেক দিন ডিএমপিতে নেই। ঢাকা থাকতে মাঝেমধ্যে আমাদের দেখা হতো; কথা হতো। কত বিপদ-আপদ, উটকো ঝামেলায় তাকে বিরক্ত করেছি—তার ইয়ত্তা নেই। শেষ বার যখন কাকী (ভাইয়ের মা) মারা গেলেন, তখন আমাদের দেখা হলো। পুলিশ হাসপাতালে আকাশচুম্বী শোক। চারপাশে শোকের মাতম। এখনো আমার চোখে স্পষ্ট সেই রাতের নিদারুণ দৃশ্য। আমার কাঁধে ভর দিয়ে সেই শেষ বার আইসিইউ থেকে কাকির মৃতদেহ দেখেছিলেন শাহাদাত ভাই। এরপর আর দেখা হয়নি আমাদের। কেন জানি না, এরপর থেকে ভাই আরও নির্জীব হয়ে গেলেন; গভীর নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।
পাঁচ: ঢাকায় থাকতে খুব কাছ থেকে দেখেছি—যাপিত জীবনের এই কোলাহল তাকে টানে না। খুব সহজ, স্বাভাবিক, মোহহীন এক জীবনেই তিনি তৃপ্ত। কী নিঃশব্দ ভালোবাসা ছড়ানোর এক বিশাল শক্তি তাঁর! অথচ একের পর এক জীবনের কঠিন সময় তিনি পার করেছেন। আমি দেখেছি, বুঝতে চেষ্টা করেছি, পাশে থেকেছি, দোয়া করেছি। কিন্তু সেই একশ টাকার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারিনি। হয়তো এ জনমে আর শোধ করতে পারব না। অবশ্য শোধ করতেও চাই না। থাকুক না এমন কিছু ভারী ঋণ।
এই ঋণই আমাদের এক করবে, শেখাবে সুখ ও যাতনার সমন্বিত উচ্চারণ, যোগাবে সাহস।
শেষকথা: যেখানেই থাকুন, যেভাবেই থাকুন আল্লাহর সাহায্য ও রহমত আপনাকে ঘিরে থাকুক। যাতনার সব অধ্যায় শেষে আসুক এক অনিন্দ্য সুন্দর ভোর।
বাসাবো ঢাকা, ০৪-১২-২০২৫
ইএইচ