রাজধানী ঢাকাসহ বহু জেলায় সকাল থেকেই নেমেছে শীত। উত্তরাঞ্চল থেকে নামতে থাকা শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে দেশের অধিকাংশ এলাকায় কুয়াশা ও শীত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শুক্রবার সকাল থেকেই রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘন কুয়াশা দেখা যায়, যা বেলা বাড়ার পরও পুরোপুরি কাটেনি।
একই সঙ্গে ঢাকাসহ মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কিছু জেলায়ও সকালের শুরুটা ছিল কুয়াশায় ঢেকে থাকা। এই আকস্মিক শৈত্যপ্রবাহে বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
উত্তরাঞ্চলে শীত বাড়ায় শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, গত কয়েক দিনের তুলনায় আজ হঠাৎ করেই শীত অনেকটা তীব্র অনুভূত হয়েছে। ভোর থেকেই বাতাসে শীতের মাত্রা বাড়তে থাকে। কুয়াশায় দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় বাস, ট্রাক, পিকআপসহ বিভিন্ন পরিবহন ধীর গতিতে চলতে দেখা গেছে। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ এবং রিকশাচালকরা। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভর করা এসব মানুষের জন্য ঠান্ডায় কাজ খোঁজা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাসার বাইরে বের হতে দেরি করেছেন, কেউ কেউ আবার কাজের জায়গায় পৌঁছেও কুয়াশা কাটার অপেক্ষায় বসে থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
রংপুরের হাটে দিনমজুর হিসেবে কাজ করা রফিকুল ইসলাম বলেন, "শুরু হইলেই শীতের কষ্ট। হাত পা বরফ হইয়া যায়। কাজ করতে না পারলে পেট চলে কী দিয়া? আজ গাড়ি–ঘোড়া কম, মানুষ বাইরেও কম বের হইছে, কাজ পাইতেছি না।"
রাজধানী ঢাকায় সকালে ঘন কুয়াশা দেখা যায়, যদিও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে থাকে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, খিলক্ষেতসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় কুয়াশার আবছা পর্দা থাকায় গাড়ি ধীর গতিতে চলেছে। সড়কের মোড়–মহল্লায় ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদেরও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে দেখা যায়।
শীতের শুরুতেই উত্তরাঞ্চলের অসহায় মানুষজনের সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় পোশাক নিয়ে। অনেক পরিবারই যথেষ্ট শীতবস্ত্রের অভাবে ভুগছে। বিশেষ করে ইটভাটা শ্রমিক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, ফুটপাতবাসী এবং নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো শীতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার এক বৃদ্ধা, সাহিদা বেগম বলেন, "একটা কম্বল আছে, ওটাই দিয়াই চলতেছি। রাত হইলেই কাঁপুনি লাগে। ছেলে–পোলা কামে গেলে কম্বলটা কই পাই?" বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তরফে শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত কম বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হাইওয়েগুলোতে গাড়ির গতি অনেক কমিয়ে চালাতে হয়েছে, ফলে যাত্রীরা পৌঁছাতে দেরি হয়েছে। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি আন্তঃজেলা রুটে সকাল ৮টা পর্যন্ত বেশ কিছু বাস চালু হতে পারেনি।
চালকরা জানান, কুয়াশায় সামনের রাস্তা ৩০–৫০ ফুটের বেশি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। এর ফলে দুর্ঘটনার শঙ্কা এড়াতে যানবাহনগুলো ধীর গতিতে চলতে বাধ্য হয়েছে।
রেলওয়ের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুয়াশার কারণে কিছু ট্রেন ২০–৩০ মিনিট দেরিতে স্টেশনে পৌঁছেছে।
শীতের শুরুতেই হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া ও সর্দি–কাশির রোগী বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু রোগী ভর্তি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ডাক্তাররা বলছেন, শীতের প্রথম ধাক্কায় শরীর দ্রুত ঠান্ডা লাগার প্রবণতা বাড়ে, তাই নিয়মিত গরম পোশাক পরা এবং শিশুকে বাইরে কমিয়ে আনা জরুরি।
ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আরিফ আহমেদ বলেন, "অনেকেই শীতকে হালকা ভাবে নেন। কিন্তু সকালে ঘন কুয়াশা ও নিম্ন তাপমাত্রা শ্বাসপ্রশ্বাসের রোগীদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। শিশু, বৃদ্ধ এবং যারা আগে থেকেই অসুস্থ তাদের বিশেষ সতর্কতা জরুরি।"
উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা শীতের কারণে মাঠের কাজ কমাতে বাধ্য হয়েছেন। আলু, গম, সরিষা, ধানের বীজতলা এবং শীতকালীন সবজির ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা কৃষিবিভাগের। দিনাজপুরের এক কৃষক জানান, ভোরে মাঠে যাওয়া যায় না, সব ভিজা। কুয়াশায় গাছের পাতায় পানি জমে থাকে, এতে অনেক সময় রোগবালাই বাড়ে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক দিন ধরে যদি কুয়াশা ঘন থাকে এবং তাপমাত্রা কমে যায়, তাহলে আলুর খেতে লেট ব্লাইটসহ অন্যান্য রোগ দেখা দিতে পারে। কৃষকদের আগাম সতর্ক হতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলে এবার শীত একটু আগেভাগেই জেঁকে বসেছে। আজ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২–১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যেতে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, আগামী দুই–তিন দিন ভোর ও সকালবেলা মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা থাকতে পারে। উত্তরাঞ্চলে শীতের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। ডিসেম্বরের শেষার্ধে একটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবছর শীত এলে দূরবর্তী অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই সরকারের শীতবস্ত্র সহায়তা কর্মসূচির আগাম প্রস্তুতি চান।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, এখনই যদি পর্যাপ্ত কম্বল, সোয়েটার, চাদর বিতরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে।
রংপুরের এক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বলেন, মাঠে–ময়দানে শীতের কষ্ট সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষের। সরকারিভাবে যদি আগেভাগে কম্বল দেওয়া হয়, তাহলে তাদের কষ্ট অনেকটা কমবে।
শীত বাংলাদেশে প্রতি বছর আসে, কিন্তু উত্তরাঞ্চলের গরিব মানুষদের জন্য শীত মানেই সংগ্রামের আরেক নাম। আজকের কুয়াশামাখা সকাল শীতের মৌসুম শুরু হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও সেই ইঙ্গিত আনন্দের নয়, বরং উদ্বেগের। তীব্র শীত, ঘন কুয়াশা, কম বেতনে কঠোর পরিশ্রম এবং অসুস্থতার ঝুঁকি সব মিলিয়ে তাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ, সামাজিক সচেতনতা এবং সহযোগিতার হাত। শীতের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু প্রকৃতির সঙ্গে নয়, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধেও।
ইএইচ