লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়

স্বপ্নের বাংলাদেশ রেখে চিরনিদ্রায় শরিফ ওসমান হাদি

বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২১, ২০২৫, ১২:০৯ এএম

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু শুধু একটি জীবনাবসান নয় এটি দেশের সচেতন তরুণ সমাজের স্বপ্ন, প্রতিবাদ ও নৈতিক শক্তির এক গভীর ক্ষত। অল্প বয়সে দেশ ও মানুষের জন্য নিবেদিত এই তরুণ নেতার চিরবিদায়ে আজ জাতি দেখেছে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন দৃশ্য।

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত তার জানাজায় অংশ নেয় লাখো মানুষ। কান্না, নীরবতা আর দৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে জাতি বিদায় জানিয়েছে এক স্বপ্নবাজ সংগ্রামীকে।

শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে দেশ-বিদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ছাড়াও জাতিসংঘের মহাসচিবসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তাদের শোকবার্তায় উঠে আসে হাদির সততা, সাহস এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্নে তার নিরলস ভূমিকার কথা।

জানাজায় অংশ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমি হাদিকে শেষ বিদায় জানাতে এখানে আসিনি। হাদি আমাদের সঙ্গেই আছে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে, তাদের চিন্তায় ও বিবেকের গভীরে। আমরা তাকে সব সময় অনুভব করব।

তার এই বক্তব্য উপস্থিত লাখো মানুষের হৃদয়ে গভীর আলোড়ন তোলে। জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে শরিফ ওসমান হাদিকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। ইতিহাস, প্রতিবাদ আর দ্রোহের কবির পাশে শায়িত হওয়া যেন প্রতীক হয়ে উঠেছে হাদির জীবনের দর্শনের ন্যায়ের পক্ষে আপসহীন অবস্থান।

শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি তরুণদের কেবল প্রতিবাদ করতে শেখাননি, বরং শিখিয়েছেন দেশকে ভালোবাসতে। তার কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে একটি কথা বাংলাদেশকে ভালোবাসতে হলে জনগণকে ভালোবাসতে হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থকে সামনে রেখে।

দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নে তিনি ছিলেন নিরলস। ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়, বরং সামষ্টিক কল্যাণই ছিল তার রাজনীতির মূল দর্শন। এই কারণেই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তরুণ সমাজের কাছে হয়ে ওঠেন অনুপ্রেরণার নাম।

জানাজা ও দাফন শেষে হাদির সহকর্মী, অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীরা শাহবাগে এক বিশাল জনসমাগম গড়ে তোলেন। সেখানে তারা সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে স্পষ্ট বক্তব্য ও আল্টিমেটাম দেন। তাদের দাবি হাদির মৃত্যুর সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, দোষীদের দ্রুত শনাক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, তারা প্রতিশোধ চান না, চান ন্যায়বিচার। তবে যথাযথ জবাব ও কার্যকর পদক্ষেপ না পেলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণাও দেন তারা।

হাদির সহযোদ্ধারা বারবার উল্লেখ করেন হাদি কখনো সহিংসতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। তিনি চাইতেন শালীন, যুক্তিনির্ভর ও নৈতিক আন্দোলন। তাই তার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সহকর্মীরা সবাইকে ধৈর্য ধারণ, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনসম্মত পথে দাবি আদায়ের আহ্বান জানান।

এক সহকর্মী বলেন, হাদির প্রতিশোধ হবে সহিংসতায় নয়, বরং তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে নৈতিক লড়াইই হবে তার প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।

শরিফ ওসমান হাদির বিদায়ে জাতি আজ শোকাহত, কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্ববানও। তার রেখে যাওয়া স্বপ্ন, আদর্শ ও সাহসিকতা এখন দেশের সচেতন নাগরিকদের জন্য এক নৈতিক দায়। এই মৃত্যু যেন আরেকটি রাজনৈতিক সহিংসতার পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে এ দাবি আজ সর্বত্র।

লাখো মানুষের চোখের পানিতে বিদায় নেওয়া হাদি হয়তো আজ নেই, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর রয়ে গেছে মানুষের বিবেকে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নই হবে তার প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।