জাতীয় ঐক্য ছাড়া সামনে এগোনো অসম্ভব: মতিউর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক  প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২১, ২০২৫, ১০:১৫ পিএম

দেশ যখন গভীর রাজনৈতিক বিভাজন, অনাস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তখন জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতার বিকল্প নেই এমন মন্তব্য করেছেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। 

তার ভাষায়, অতিরিক্ত বিরোধ ও বিভক্তি শুধু রাজনীতিকেই দুর্বল করে না, রাষ্ট্র পরিচালনাকেও অকার্যকর করে তোলে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বহুল আলোচিত ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ উপলক্ষে রাজধানীর র‌্যাডিন ব্লু হোটেলে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। 

দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন ও রেডিওর শীর্ষ সম্পাদক এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সভা আয়োজন করে ‘তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কমিটি’। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

মতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতি নয়। এই শূন্যতা নানা বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। তাঁর মতে, তারেক রহমান যদি আরও আগে দেশে ফিরতে পারতেন, তাহলে রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়তো ভিন্ন রূপ নিতে পারত। বিএনপির নেতৃত্বশূন্য সময়টি দলটির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তেমনি জাতীয় রাজনীতিতেও প্রশ্নের অবকাশ রেখে গেছে।

তিনি মনে করেন, আগামী দিনে যে দল সরকার গঠন করবে, তাদের জন্য সময়টি হবে দেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি। জনগণের প্রত্যাশা যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি হতাশাও গভীর। এই বাস্তবতায় ক্ষমতায় যেতে চাওয়া দলের নেতৃত্বে সংযম, সহনশীলতা ও আত্মসমালোচনার মানসিকতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে।

বিএনপির প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, বিভিন্ন জরিপে দলটি এখনো দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের বড় ব্যবধানে জয়ের সম্ভাবনাও আলোচিত হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো দলের আচরণই সবচেয়ে বেশি নজরে থাকে। নেতৃত্বের ভাষা, প্রার্থীদের নির্বাচন এবং রাজনৈতিক বিনয় সবকিছুই তখন জনআস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়। বিএনপির প্রার্থী তালিকা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে, সে বিষয়ে পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে বলেও মত দেন তিনি।

গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, বিএনপির আগের শাসনামলে সংবাদপত্র যে পুরোপুরি স্বস্তিতে ছিল এমন দাবি তিনি করছেন না। তবে তুলনামূলকভাবে সেই সময়টিতে মতপ্রকাশের পরিসর কিছুটা বেশি ছিল। 

বিপরীতে, গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সংবাদমাধ্যম নজিরবিহীন চাপ, ভয় এবং হস্তক্ষেপের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি অভিযোগ করেন, এই সময়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ, মালিকানা পরিবর্তনের চাপ, সম্পাদক বদলের চেষ্টা এবং শেয়ার হস্তান্তরের মতো ঘটনা সংবাদপত্র শিল্পকে গভীর অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। শুধু একটি পত্রিকা নয়, গোটা গণমাধ্যম ব্যবস্থাই এই চাপের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই করেছে।

ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে কেবল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট হবে না। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা যেখানে ভিন্নমত থাকবে, সমালোচনা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। এতটা বিভক্ত সমাজ নিয়ে কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের প্রতি তার বার্তা ছিল স্পষ্ট গণতান্ত্রিক পথে চলতে চাইলে সমালোচনা শুনতেই হবে। শুনবেন, বুঝবেন মানবেন কি না, তা সরকারের সিদ্ধান্ত। কিন্তু না শুনলে একই ভুল বারবার ফিরে আসবে।

মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের পথচলা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সব মিলিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই উঠে এসেছে: জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে এগোনো সম্ভব নয়।

ইএইচ