৪৪ বছর পর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ইতিহাসের অশ্রুসিক্ত পুনরাবৃত্তি

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৫:২৫ পিএম

ঢাকার আকাশ আজ মেঘলা না হলেও এক অদৃশ্য কুয়াশায় ঢাকা ছিল চারপাশ সে কুয়াশা শোকের, সে কুয়াশা প্রিয় নেত্রীকে হারানোর হাহাকারের। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ আজ কেবল একটি রাজপথ ছিল না; এটি পরিণত হয়েছিল ইতিহাসের এক শোকাতুর মোহনায়। যেখানে ৪৪ বছর আগে এক নিথর দেহকে বিদায় জানিয়েছিল 

বাংলাদেশ, আজ সেখানে আবারও নেমে এলো সেই একই বিষাদ। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৪ বছর পর, একই স্থানে, একই মর্যাদায় বিদায় নিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এই প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো, আর বাংলাদেশ হারালো তার এক আপসহীন অভিভাবককে।

ইতিহাস মাঝেমধ্যে অদ্ভুতভাবে নিজেকে ফিরে পায়। ১৯৮১ সালের ২ জুন। চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে ঘাতকের বুলেটে শহীদ হওয়া রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। সেদিন ঢাকার রাজপথ ভিজেছিল মানুষের চোখের জলে। তখন পাশে ছিলেন এক শোকাতুর গৃহবধূ, যার নাম খালেদা জিয়া।

৪৪ বছর পর, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর। সেই একই স্থানে আজ শুয়ে আছেন সেই মহীয়সী নারী। গৃহবধূ থেকে যিনি হয়ে উঠেছিলেন এদেশের কোটি মানুষের আশার বাতিঘর। ৪৪ বছর আগে স্বামী হারানোর শোক নিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, আজ সেই যাত্রার যবনিকা পড়ল স্বামীর পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার মাধ্যমে। ১৯৮১ সালের সেই বিশাল জনসমুদ্র আর ২০২৫ সালের এই শোকার্ত মানুষের ঢল প্রমাণ করে দিল জিয়া ও খালেদা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন এদেশের মানুষের স্পন্দন।

সকাল থেকেই রাজধানী যেন স্থবির হয়ে পড়েছিল। উত্তরা থেকে মতিঝিল, আসাদগেট থেকে কারওয়ান বাজার সব পথ এসে মিশেছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। লাখো মানুষের কালো সমুদ্র। কালো পোশাক, কালো ব্যাজ আর হাতে ধরা প্রিয় নেত্রীর ছবি। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে জনস্রোত খামারবাড়ি, ফার্মগেট, আগারগাঁও এমনকি মোহাম্মদপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

মানুষের ভিড় এতই ছিল যে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। তবুও ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে মাঝেমধ্যে ভেসে আসছিল গুমরে ওঠা কান্নার শব্দ। কেউ দূর থেকে এসেছেন শেষবারের মতো মা-কে দেখতে, কেউবা এসেছেন এক নজর কফিনটি ছুঁয়ে দেখার আশায়। এই জনসমুদ্র কেবল একটি দলের শক্তি প্রদর্শন ছিল না, এটি ছিল একজন নেত্রীর প্রতি একটি জাতির অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

জানাজা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ান মরহুমার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করা এই সন্তান যখন কথা বলতে শুরু করেন, তখন পুরো এলাকায় পিনপতন নীরবতা নেমে আসে।

তারেক রহমান বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। আজকের এই শোকাতুর পরিবেশে যারা উপস্থিত আছেন, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই আমার মা জীবিত থাকাকালে যদি আপনাদের কারো কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, দয়া করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি সেই ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করব ইনশাআল্লাহ। 

এরপর তিনি আরও যোগ করেন, আমার মা যদি তাঁর দীর্ঘ জীবনে কোনো ব্যবহারে বা কথায় কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকেন, তবে তাঁর সন্তান হিসেবে আমি আপনাদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনারা আমার মা-কে ক্ষমা করে দেবেন। একজন প্রতাপশালী নেত্রীর পুত্রের এই বিনম্রতা ও ক্ষমা প্রার্থনা উপস্থিত জনতাকে অঝোরে কাঁদিয়েছে। রাজপথের প্রতিটি ধুলিকণা যেন তখন সেই হাহাকারে শামিল হয়েছিল।

বিকেল ৩টার কিছু আগে শুরু হয় জানাজা। জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। এটি সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জানাজা হিসেবে লিপিবিদ্ধ থাকবে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জানাজায় অংশ নেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিদেশি কূটনীতিক এবং তিন বাহিনীর প্রধানগণ। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় বিদায়। জানাজা শেষে যখন পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হচ্ছিল, তখন বিউগলের করুণ সুর চারপাশের পরিবেশকে আরও বেশি ভারাক্রান্ত করে তোলে।

বিকেল সাড়ে ৪টা। রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের জিয়া উদ্যান। যেখানকার সবুজ ঘাসের নিচে ৪৪ বছর ধরে একাকী শুয়ে ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আজ সেখানে তাঁর প্রিয়তমা সহধর্মিণীকে নিয়ে আসা হলো। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তোপধ্বনির মাধ্যমে তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হলো।

দাফনের সেই মুহূর্তটি ছিল হূদয়বিদারক। কবরে প্রথম মাটি ছিটিয়ে দেন তারেক রহমান। একে একে পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান, শামিলা রহমান এবং নাতনি জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা তাঁদের চিরচেনা ‘দাদি’ ও ‘মা’কে মাটির চাদরে ঢেকে দেন। এরপর তিন বাহিনীর প্রধানগণ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান ও নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান কবরে মাটি দেন।

দাফন শেষে যখন মোনাজাত করা হচ্ছিল, তখন অস্তমিত সূর্যের লাল আভা জিয়া উদ্যানের কবরের ওপর আছড়ে পড়ছিল। জনতা মনে করছিল, দীর্ঘ ৪৪ বছরের বিচ্ছেদের পর আজ জিয়া ও খালেদা আবারও এক হলেন পার্থিব জীবনের সীমানা পেরিয়ে মহাকালের পথে।

১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এসেছিলেন এক বিশেষ পরিস্থিতিতে। ১৯৮১ সালে স্বামী হারানোর পর বিএনপির অস্তিত্ব যখন সংকটে, তখন গৃহবধূ থেকে এক দৃঢ়চেতা নেত্রীরূপে আবির্ভূত হন তিনি। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি স্থাপন করেছিলেন এক অনন্য উচ্চতা। দীর্ঘ ৪১ বছর বিএনপির হাল ধরে তিনি প্রমাণ করেছেন আপসহীনতা কাকে বলে। কারাবরণ, গৃহত্যাগ আর শারীরিক অসুস্থতা কোনো কিছুই তাঁকে এদেশের মাটি ও মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। শেষ সময়ে এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাস ছিল এই মাটির জন্য।

দাফন শেষ হয়ে গেলেও হাজারো মানুষ তখনো জিয়া উদ্যানের আশেপাশে ভিড় করে ছিলেন। প্রিয় নেত্রীকে কবরে রেখে যাওয়ার সময় কর্মীরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছিলেন। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল আকস্মিক, কিন্তু দেশের প্রয়োজনে তিনি ছিলেন অপরিহার্য। আজ সেই অপরিহার্য অভিভাবককে হারিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথ যেন কিছুটা হলেও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল।

বেগম খালেদা জিয়া আজ আর আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আপসহীন সংগ্রামের আদর্শ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি তাঁর অগাধ মমতা এবং দেশপ্রেমের মহিমা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে অম্লান থাকবে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সেই জনসমুদ্র আর জিয়া উদ্যানের সেই নীরব শয়ান এই দুইয়ের মাঝে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের কয়েক দশকের সংগ্রাম ও বিজয়ের গল্প।

তিনি শুয়ে আছেন তাঁর প্রিয় স্বামীর পাশে, শেরে বাংলা নগরের শান্ত শীতল ছায়ায়। যে মানুষটি সারা জীবন মানুষকে ভালবেসেছেন, আজ সেই মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়েই তিনি বিদায় নিলেন। মহাকালের এই নেত্রীর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

শান্তিতে ঘুমান হে দেশমাতা, বাংলাদেশ আপনাকে কোনোদিন ভুলবে না। আপনার ত্যাগের ঋণ এ জাতি শোধ করতে পারবে না কোনোদিন।

জেএইচআর