আবু সাঈদ ও মীর মুগ্ধদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বোনা হয়েছিল, সেই স্বপ্নের ক্যানভাসে ২০২৫ সাল ছিল এক কঠিন পরীক্ষার বছর।
আজ ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫। বছরের শেষ সূর্য যখন দিগন্তের ওপারে মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন পেছনে ফেলে আসা ১২টি মাসের হিসাব মেলাতে বসলে দেখা যায়, অনিশ্চয়তা, সংস্কারের লড়াই আর এক নক্ষত্রের পতনের দীর্ঘশ্বাসে মোড়ানো ছিল এই বছরটি।
স্বপ্নের সূচনা বনাম বাস্তবের রূঢ়তা
২০২৫ সালের শুরুটা হয়েছিল এক বুক আশা নিয়ে। গত ১ জানুয়ারি জনৈক অভিভাবক বলেছিলেন, ‘যে সন্তানদের রক্তে নতুন বাংলাদেশ পেলাম, সে বাংলাদেশটা ভালো থাকুক।’ কিন্তু বছর শেষে এসে তাঁরই কণ্ঠে বেজে উঠেছে হতাশার সুর, দেশটা যেভাবে চলার কথা, সেভাবে চলছে না। ২০২৫ সালে রাষ্ট্রযন্ত্রের মদদে গুম, খুন বন্ধ হলেও, নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘মব কালচার’ বা বিচারব্যর্ভূত গণপিটুনির উন্মাদনা।
বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রীয় চাপ কমলেও, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হামলা ও ভীতি প্রদর্শন সাংবাদিকতাকে এক নতুন সংকটে ফেলেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ভবনে সুসংগঠিত হামলা সেই নিরাপত্তাহীনতারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
আইনি মুক্তি ও বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়
বছরের শুরুতেই অর্থাৎ ১৫ জানুয়ারি দেশের উচ্চ আদালত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এতিমখানা ট্রাস্ট মামলার সাজা বাতিল করে তাঁকে কলঙ্কমুক্ত করে। তবে ২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় শোকাবহ ঘটনা ছিল তাঁর প্রয়াণ। বছরের শুরুতে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়েছিলেন, ফিরেও এসেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার সাথে লড়াই করে বছরের শেষে তার জীবনাবসান ঘটে।
৪৪ বছর আগে যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে স্বামী জিয়াউর রহমানকে বিদায় দিয়েছিল লাখো মানুষ, আজ সেখানেই প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাল বাংলাদেশ। তার মৃত্যু কেবল একটি দলের ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বর্ণিল ও দীর্ঘ অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি।
৩১ ডিসেম্বরের জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, তিনি ছিলেন জাতীয় ঐক্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রাজনীতির নতুন সমীকরণ ও ‘জুলাই সনদ’
২০২৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ ঘটে তরুণদের নতুন দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। ১০ মে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে পুরোনো এক রাজনৈতিক মেরুকরণের অবসান ঘটে। ১ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরকারি প্লট বরাদ্দ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে অনুপস্থিতিতেই সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বছরের শেষার্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষরিত হয়, যা রাষ্ট্র সংস্কারের এক রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সনদের ওপর ভিত্তি করেই আগামীতে গণভোট হওয়ার কথা রয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠন এবং পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ পাসের মাধ্যমে প্রশাসনিক সংস্কারের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে।
অর্থনীতির অলিগলি: আয় ও ব্যয়ের অসম লড়াই
সাধারণ মানুষের জন্য ২০২৫ সাল ছিল চরম অর্থনৈতিক কষ্টের বছর। বিভিন্ন গণমাধ্যমের জাতীয় জনমত জরিপ ২০২৫ অনুযায়ী, ১২ শতাংশ মানুষের আয় বাড়লেও খরচ বেড়েছে ৭৯ শতাংশ মানুষের। ৪৩ ধরনের পণ্য ও সেবার ওপর নতুন ভ্যাট আরোপ মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিল। জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার নিচে নেমে আসা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েনে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। ক্রীড়াঙ্গনে অবশ্য ৭ ফেব্রুয়ারি বিপিএল-এর ফাইনালে ফরচুন বরিশালের টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয় কিছুটা স্বস্তি এনেছিল।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন
বছরের শেষভাগে রাজনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ২৫ ডিসেম্বর তিনি যখন ঢাকা বিমানবন্দরে নামেন, তখন লক্ষ মানুষের উপস্থিতি জানান দেয় দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের শক্তির কথা। তাঁর মায়ের মৃত্যু আর তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, এই দুই ঘটনা বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে এক নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
রক্ত ও অগ্নিকুণ্ডের স্মৃতি
২০২৫ সাল কেবল রাজনৈতিক উত্তাপেই নয়, বড় বড় দুর্ঘটনায় শোকের সাগরে ভাসিয়েছে জাতিকে। মে ও জুন মাস জুড়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভয়াবহ বন্যা ১৮ মিলিয়ন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২১ জুলাই উত্তরায় বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে ২৮ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু ছিল এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। ১৪ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরের রাসায়নিক গুদামে আগুন, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড এবং ২৬ নভেম্বর মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে যুবকের মৃত্যু প্রশাসনের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বছরের শেষ দিকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড নির্বাচনী পরিবেশকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সংস্কার-নির্বাচন: কোন পথে বাংলাদেশ?
বছরজুড়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল, আগে সংস্কার নাকি আগে নির্বাচন? অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের ওপর জোর দিলেও, মব সন্ত্রাস এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা মানুষকে দ্রুত নির্বাচনের দাবির দিকে ঠেলে দিয়েছে। অবশেষে ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। একজন লেখকের ভাষায়, ‘মানুষ বুঝে গেছে প্রত্যাশিত সংস্কার হয়তো হবে না, তাই নতুন সরকারের সঙ্গেই বোঝাপড়া করা ভালো।’
অনিশ্চিত এক আশার নাম ২০২৬
২০২৫ সাল ছিল মূলত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সেতু। যে সেতুর এক প্রান্তে ছিল স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার আনন্দ, আর অন্য প্রান্তে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ৫৪ বছর ধরে এদেশের মানুষ যে ন্যায়বিচার, বাকস্বাধীনতা আর সুশাসনের স্বপ্ন দেখছে, ২০২৫ সাল তার সবটুকু পূরণ করতে না পারলেও একটি পথ তৈরি করে দিয়ে গেছে। জেন জি বা নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা আর অভিজ্ঞ রাজনীতির দ্বন্দ্বের মাঝেই কাটল এই বছরটি।
একটি সিনেমার সেই বিখ্যাত সংলাপের মতো, আশা খুব ভালো একটি জিনিস, আর ভালো জিনিসের মৃত্যু হয় না। ২০২৫-এর ব্যর্থতা আর সফলতাকে সঙ্গী করে বাংলাদেশ এখন ২০২৬-এর দিকে তাকাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কি পারবে শহীদদের মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে? উত্তরটি মহাকালের হাতে জমা থাকলেও, বাংলাদেশের মানুষ এক অনিশ্চিত কিন্তু গভীর আশা নিয়ে বছরের শেষ সূর্যকে বিদায় জানাচ্ছে।
বিদায় ২০২৫। স্বাগতম ২০২৬, গণতন্ত্রের সূর্যোদয় হোক তোমার হাত ধরে।
ইএইচ