চট্টগ্রামের ‘নিষিদ্ধ সাম্রাজ্যে’ রক্তক্ষয়ী সংঘাত, প্রাণ হারালেন র‍্যাব কর্মকর্তা

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

ট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর, প্রকৃতির কোলঘেঁষা এক নিভৃত অঞ্চল হওয়ার কথা ছিল এটি। কিন্তু চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পাহাড় কাটা, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দাপটে এ এলাকাটি এখন যেন বাংলাদেশের মানচিত্রের ভেতরেই এক ‘অঘোষিত নিষিদ্ধ রাষ্ট্র’। প্রশাসনের যেকোনো উদ্যোগের বিপরীতে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা এ এলাকায় সোমবার সন্ধ্যায় ফের ঝরল রক্ত। 

সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন র‍্যাব ৭ এর উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। আহত হয়েছেন আরও অন্তত চারজন র‍্যাব সদস্য। এ ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে শহরের এত কাছে ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড় জুড়ে কীভাবে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী নিজেদের সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েম করে রাখতে পারে?

বিশ্বস্ত সূত্রে খবর ছিল, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের গহিন পাহাড়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ করা হয়েছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে আজ সোমবার সন্ধ্যায় র‍্যাব ৭ এর একটি চৌকস দল অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নামে। কিন্তু তারা যখন দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা ধরে জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে প্রবেশ করছিল, তখনই ওঁত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। 

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, সন্ত্রাসীরা শুধু ঢিল বা লাঠিসোঁটা নয়, সরাসরি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে র‍্যাব সদস্যদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। হামলায় চারজন র‍্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। তাদের দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। র‍্যাবের সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এআরএম মোজাফফর হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এ এলাকাটি আয়তনে বিশাল, প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। ভৌগোলিকভাবে এটি সীতাকুণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হলেও এর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অবস্থান চট্টগ্রাম মহানগরের একদম গা ঘেঁষে। পূর্ব দিকে হাটহাজারী এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা, এ ত্রিভুজ সীমানায় ঘেরা এলাকাটি কার্যত দুর্ভেদ্য এক দুর্গে পরিণত হয়েছে। 

গত ৪০ বছর ধরে এখানে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি। আর এ বসতিগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ‘প্লট বাণিজ্য’। কথিত ‘ছিন্নমূল’ মানুষের আবাসন দেওয়ার নাম করে এখানে কোটি কোটি টাকার পাহাড় বাণিজ্যের সাম্রাজ্য গড়েছে স্থানীয় ক্যাডাররা।

জঙ্গল সলিমপুরের সবচেয়ে আতঙ্কের দিকটি হলো এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এলাকাটিতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। এখানকার প্রতিটি প্রবেশপথে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়। বাসিন্দাদের জন্য রয়েছে আলাদা পরিচয়পত্র। এ পরিচয়পত্র ছাড়া এলাকার কোনো বাসিন্দা যেমন বাইরে যেতে পারেন না, তেমনি বাইরের কেউ ভেতরে ঢুকতে পারেন না। এমনকি পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও এখানে ঢুকতে হলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢুকতে হয়।

 এর আগেও বহুবার এ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে প্রশাসন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ওসিসহ ২০ জন আহত হন ককটেল ও ইটপাটকেলের হামলায়। ২০২২ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পর পর দুইবার উচ্ছেদ অভিযানে বাধা দেওয়া হয় এবং পুলিশের ওপর সরাসরি হামলা চালানো হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের দখল নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। পুরনো নিয়ন্ত্রণ হারানো দল বনাম নতুন আধিপত্য বিস্তারকারী দলের মধ্যে চলছে দফায় দফায় বন্দুকযুদ্ধ। সম্প্রতি এ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেখানে সন্ত্রাসীদের হাতে নিষ্ঠুরভাবে মারধরের শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিকও। 

রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে পাহাড় কাটার মহোৎসব এখন চরমে। দিনের আলোতে যেমন পাহাড় কাটা চলছে, রাতে তেমনি চলছে সশস্ত্র মহড়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এ এলাকাটি এখন অপরাধীদের ‘সেফ হাউজ’ বা নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। নগরে অপরাধ ঘটিয়ে সন্ত্রাসীরা অনায়াসেই এ দুর্গম পাহাড়ে আত্মগোপন করে থাকে।

জঙ্গল সলিমপুর শুধু অপরাধের আখড়া নয়, এটি পরিবেশের জন্য এক বড় ক্ষত। পাহাড়ের পর পাহাড় ন্যাড়া করে সেখানে অবৈধ ঘর তোলা হয়েছে। বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের হাজারো প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখানে বিদ্যুৎ ও পানির অবৈধ সংযোগও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিশাল এলাকাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়, যার ভাগ পৌঁছায় উপরমহল পর্যন্ত। এ কারণেই বছরের পর বছর উচ্ছেদ অভিযান হলেও তা কখনোই চূড়ান্ত রূপ পায় না।

র‍্যাব কর্মকর্তার মৃত্যু এ সংকটের গভীরতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা আজ রাতেই জরুরি বৈঠকে বসেছেন। পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকা ঘিরে বড় ধরনের সম্মিলিত অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, সাময়িক অভিযান কি পারবে দীর্ঘ ৪০ বছরের এ অন্ধকার সাম্রাজ্যকে গুঁড়িয়ে দিতে? 

সাধারণ মানুষের দাবি, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে শুধুমাত্র অপরাধীদের ধরলে হবে না, এর পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী আশ্রয়দাতাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। না হলে বারবার এ পাহাড়ে রক্ত ঝরবে এবং রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব হারাবে একদল অস্ত্রধারী দস্যুর কাছে। নিহত ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার মৃত্যু যেন বৃথা না যায়, সেজন্য জঙ্গল সলিমপুরকে স্থায়ীভাবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনা এখন সময়ের দাবি।

ইএইচ