আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি: জাতীয় স্বার্থের ‘রক্তক্ষরণ’ ও বছরে ৬ হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২৬, ০১:০৬ পিএম

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ও অসম চুক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি। সরকারের গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র—যেখানে দেখা যাচ্ছে, কেবল এই একটি চুক্তির মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলাদেশের পকেট থেকে বাড়তি ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে আদানি গ্রুপ। গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ খাতে যে 'রাষ্ট্রীয় দখলের' সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, আদানি চুক্তি তারই এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ।

গতকাল রোববার বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্যরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যেসব চুক্তি রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে, সেগুলোতে দ্রুত 'অস্ত্রোপচার' বা সংশোধন প্রয়োজন। কমিটির মতে, আদানির চুক্তিটি এতটাই একপেশে যে, এটি বাতিল বা সংশোধন করা ছাড়া রাষ্ট্রের দর-কষাকষির ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।

কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানির সঙ্গে করা এই চুক্তিটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি কাঠামোগত অপরাধ। ২৫ বছরের মেয়াদে তারা বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার (১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি) বাড়তি নিয়ে যাবে। এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজনে আমাদের সাময়িক লোডশেডিংয়ের কষ্ট মেনে নিতে হবে, তবুও এই লুণ্ঠন চলতে দেওয়া যায় না।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, যখন ভারত থেকে আমদানিকৃত অন্যান্য বিদ্যুতের গড় দাম ছিল ইউনিট প্রতি ৪.৪৬ সেন্ট, তখন আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয় ৮.৬১ সেন্টে। এই আকাশচুম্বী দাম নির্ধারণের পেছনে চুক্তিতে এমন এক 'অদ্ভূত সূচক' ব্যবহার করা হয়েছে, যা আদানিকে বাজারমূল্যের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি মুনাফা নিশ্চিত করে। কমিটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এই বাড়তি অর্থ কোনো কারিগরি কারণে নয়, বরং দুর্নীতির মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।

'দেশের বাইরে বসে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কিন্তু ঝুঁকি বাংলাদেশের'—এই শিরোনামে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে আখ্যায়িত করেছে জাতীয় কমিটি। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো সংকটে যদি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তার ক্ষতিপূরণও দিতে হবে বাংলাদেশকে। এমনকি কয়লা আমদানির ক্ষেত্রেও অস্পষ্টতা রাখা হয়েছে। ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় কেন এই কেন্দ্রটি করা হলো, যেখানে স্থানীয় কয়লা ব্যবহারযোগ্য নয়, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা সরকারি নথিতে পাওয়া যায়নি।

কমিটির প্রতিবেদনে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয় থেকে সরাসরি নির্দেশে এই চুক্তিগুলো সম্পাদিত হয়েছিল। সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। কমিটি জানিয়েছে, চুক্তির সঙ্গে জড়িত অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে কয়েক মিলিয়ন ডলারের সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মূলত একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে লাভবান করতেই জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫ গুণ বাড়লেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বেড়েছে ১১ গুণ। এর ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। ২০১৫ সালে যেখানে পিডিবির লোকসান ছিল সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা ৫০ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে।

কমিটি বলছে, প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে আছে। এই অলস কেন্দ্রগুলোকে 'ক্যাপাসিটি চার্জ' বা কেন্দ্রভাড়া বাবদ প্রতি বছর ৯০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে পিডিবিকে টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুতের দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে, যা সাধারণ মানুষ ও শিল্পের জন্য হবে মরণকামড়।

কেবল আদানি নয়, দেশি-বিদেশি আরও কয়েকটি বড় গ্রুপের চুক্তিতেও ভয়াবহ অনিয়ম পেয়েছে কমিটি:

এস আলম গ্রুপ: কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে এস আলমের এসএস পাওয়ার কেন্দ্রটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল।

রিলায়েন্স: ভারতের একটি পরিত্যক্ত বা অচল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশে এনে বসানোর প্রক্রিয়াটি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

সামিট গ্রুপ: সামিটের মেঘনাঘাট-২ কেন্দ্রটি সমজাতীয় অন্যান্য কেন্দ্রের তুলনায় দ্বিগুণ ব্যয়বহুল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও সামিট দাবি করেছে তারা সর্বনিম্ন ট্যারিফেই কাজ করেছে।

কমিটির আহ্বায়ক হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী জানান, আদানির চুক্তি পর্যালোচনায় বিপুল প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য ইতিমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং উচ্চ আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। কমিটি পরামর্শ দিয়েছে, দ্রুত সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে মামলা করতে হবে। বিলম্ব করলে আইনি ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তবে চূড়ান্তভাবে চুক্তি বাতিল বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের সিদ্ধান্তটি একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকেই নিতে হবে বলে মনে করে কমিটি।

চুক্তি বাতিলের পথে হাঁটলে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে, যার ফলে দেশে লোডশেডিং বাড়তে পারে। কমিটির সদস্যরা মনে করেন, ২৫ বছরের অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে দেশের মানুষকে অন্তত ২ থেকে ৪ বছর এই কষ্ট সহ্য করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এখনই এই লুণ্ঠন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

আদানি গ্রুপ এক লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছে, তারা এই কমিটির প্রতিবেদন এখনও পায়নি এবং কোনো কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। বকেয়া থাকা সত্ত্বেও তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে বলে দাবি করেছে।

বিদ্যুৎ খাতের এই মহালুটপাটের চিত্রটি কেবল আর্থিক ক্ষতির হিসাব নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অর্থের চূড়ান্ত অবমাননা। অন্তর্বর্তী সরকারের এই প্রতিবেদনটি ভবিষ্যতে একটি স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ জ্বালানি নীতি প্রণয়নে মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার আদানির মতো 'রক্তক্ষরণকারী' চুক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কতটা কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

এএন