অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষলগ্নে প্রতিরক্ষা কূটনীতি: সংস্কার না কি দীর্ঘমেয়াদী সমরাস্ত্র সজ্জা?

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। একদিকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অন্যদিকে মেয়াদের একেবারে শেষ সময়ে এসে একের পর এক শক্তিশালী দেশের সাথে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি করা হচ্ছে। বিশেষ করে চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর সাথে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটার বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। 

সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এসব চুক্তিকে চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এ বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ে জনমনে নানামুখী প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার কেবল সংস্কার নয়, বরং দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও অভূতপূর্ব গতি দেখিয়েছে। সরকারের হাতে নেওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে আকাশপথের শক্তি বৃদ্ধিতে পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার এবং চীন থেকে অত্যাধুনিক জে-১০ সি যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া। পাশাপাশি ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম থেকে ইউরো ফাইটার টাইফুন কেনার আলোচনা চলছে। 

হেলিকপ্টার বহরের জন্য তুরস্ক থেকে টি-১২৯ অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশ্বখ্যাত ব্ল্যাক হক মাল্টিরোল হেলিকপ্টার সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নৌ ও ডুবো শক্তি বৃদ্ধিতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সাবমেরিন ক্রয় এবং ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ যুদ্ধজাহাজের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। প্রযুক্তগত স্বনির্ভরতা অর্জনে চীনের সহায়তায় দেশে ড্রোন কারখানা তৈরির সরকারি চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান আজ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটা কোনো হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া যা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। 

পরবর্তী সরকার এগুলো গ্রহণ করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বিষয়টিকে অনুমাননির্ভর বলে উড়িয়ে দেন। একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদে নিজের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ওঠা সমালোচনার জবাবে তিনি কিছুটা রসিকতা ও দৃঢ়তার সাথে বলেন, দুনিয়ার সব দেশে তো আমাদের মতো প্রেক্ষাপট নেই।

একদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের এ প্রতিরক্ষা কূটনীতি নতুন সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে। সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছে, একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ যেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা, সেখানে কয়েক হাজার কোটি টাকার সামরিক চুক্তি কেন এ সময়ে প্রয়োজন হলো। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়ার বলয় থেকে বেরিয়ে তুরস্ক বা পাকিস্তানের মতো বিকল্প দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন সামরিক ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। এ ছাড়া সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে তাদের পেশাদারিত্ব ও মনোবল চাঙ্গা রাখা এবং যে সরকারই আসুক, দেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করাই এর উদ্দেশ্য।

বিএনপি নেতা তারেক রহমান এবং জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান যখন ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন, তখন সরকারের এ বিশাল সামরিক কেনাকাটা জনগণের মনে কিছুটা দ্বিধা তৈরি করছে। 

প্রশ্ন উঠছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কি কোনো নীল নকশার অংশ, নাকি এ প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত গড়তে সাহায্য করবে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ চায় এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দিনের ভোট দিনেই হবে। বিগত ১৫ বছরের রাতের ভোটের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে মানুষ এখন রাজপথে উৎসবের আমেজ দেখছে। তারা চায় নতুন সরকার এসে যেন আত্মীয়করণ বা পারিবারিক তন্ত্র গড়ে না তোলে।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ভাষায় এটি চলমান প্রক্রিয়া হলেও, সময় নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, দেশের শীর্ষ দুই রাজনৈতিক দলের প্রধানরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। 

গণতন্ত্রের এ স্রোত যদি অব্যাহত থাকে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ হয়, তবে এ সামরিক আধুনিকায়ন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করবে। জনগণ কেবল আধুনিক যুদ্ধবিমান বা সাবমেরিন চায় না, তারা চায় তাদের ভোটাধিকারের নিরাপত্তা। 

নতুন যে সরকারই আসুক, তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বিগত সরকারের একনায়কতন্ত্রের প্রেতাত্মা ঝেড়ে ফেলে একটি সত্যিকারের জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

ইএইচ