ডিজিটাল অপপ্রচার ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: যমুনা টিভির ভুয়া ফটোকার্ড নিয়ে বিভ্রান্তি

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নির্বাচনের মাঠ যেমন রাজপথে থাকে, তেমনি এর একটি বড় অংশ দখল করে থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো ভুয়া খবর বা মিথ্যা সংবাদের ব্যাপক বিস্তার। ভোটগ্রহণের আগের রাতেও এই অপপ্রচারের থাবা থেকে রেহাই পায়নি দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভি।

ভোটের আগের দিন অর্থাৎ বুধবার রাত থেকে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে একটি ডিজিটাল তথ্যচিত্র বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটির অবয়ব অবিকল যমুনা টেলিভিশনের লোগো ও গ্রাফিক্সের মতো। সেখানে বড় অক্ষরে লেখা ছিল যে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে বিএনপি। পোস্টগুলোর ক্যাপশনে দাবি করা হয় যে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তনের কারণে বিএনপি মধ্যরাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে এবং তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে।

ভোটের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে এমন সংবেদনশীল তথ্য সাধারণ ভোটার এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি ও উত্তেজনার সৃষ্টি করে। কিছু সময়ের মধ্যেই পোস্টটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী পোস্টটিতে প্রায় ৩ হাজার ২০০টির বেশি প্রতিক্রিয়া পড়ে, মন্তব্য জমা হয় প্রায় ১০০টি এবং শেয়ার হয় ৮০ বারেরও বেশি। অনেক সাধারণ ব্যবহারকারী এটিকে সত্য বলে ধরে নিয়ে প্রচার করতে থাকেন, যা জনমনে এই ধারণা তৈরি করে যে নির্বাচনের সমীকরণ হয়তো শেষ মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে।

তথ্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন তথ্য যাচাইকারী দল এবং সচেতন নাগরিকরা এর সত্যতা অনুসন্ধানে নামেন। যমুনা টেলিভিশনের দাপ্তরিক ফেসবুক পাতা, ওয়েবসাইট কিংবা চলমান সংবাদে এমন কোনো তথ্যচিত্র বা সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে তাদের লোগো ব্যবহার করে এই ডিজিটাল কার্ডটি সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত কারসাজির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। অনুসন্ধানে আরও দেখা যায় যে যমুনা টিভির ওয়েবসাইটে রাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে বিএনপি শিরোনামে একটি প্রকৃত সংবাদ ছিল, কিন্তু সেখানে নির্বাচন বর্জনের কোনো কথা উল্লেখ ছিল না।

একই বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল নেতা কর্মীদের ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান বিএনপির। অর্থাৎ সংবাদ সম্মেলনটি ছিল মূলত কর্মীদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য, ভোট বর্জনের জন্য নয়। সারকথা হলো বিএনপি ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়নি বরং কর্মীদের কেন্দ্রে থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। একটি প্রকৃত সংবাদের শিরোনাম বিকৃত করে ছবি সম্পাদনার সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভুয়া কার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে ভোটের আগের রাতে যখন ভোটাররা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেন, তখন এমন গুজব ছড়ানোর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ভোটার উপস্থিতি কমানো। প্রার্থীর সমর্থকরা যদি মনে করেন তাদের দল নির্বাচন বর্জন করছে তবে তারা কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

এছাড়া রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা ছড়ানো যাতে সাধারণ মানুষ কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা আলাদা করতে হিমশিম খায়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের এই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে যে ইন্টারনেটে দেখা মাত্রই কোনো তথ্য বিশ্বাস করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে উৎসের সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

কোনো ডিজিটাল তথ্যচিত্র দেখলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের দাপ্তরিক পাতা বা ওয়েবসাইটে গিয়ে তা মিলিয়ে দেখা উচিত। শুধুমাত্র ছবি দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংবাদের বিস্তারিত সংযোগ খুঁজে বের করা প্রয়োজন। নিশ্চিত না হয়ে কোনো রাজনৈতিক খবর প্রচার করা উচিত নয় কারণ আপনার একটি প্রচার জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে পারে। গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হলো সঠিক তথ্য। যমুনা টিভির নাম ব্যবহার করে বিএনপির ভোট বর্জনের যে গুজব ছড়ানো হয়েছে তা মূলত সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশকে কলুষিত করার একটি অপচেষ্টা।

প্রযুক্তির এই অপব্যবহার রোধ করতে একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি প্রয়োজন তেমনি নাগরিকদের সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনো ভুয়া খবর যেন আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে লক্ষ্য রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

জেএইচআর