বাংলাদেশে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা ইতিমধ্যেই শপথ নিয়েছেন। এবারের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে—রাষ্ট্রপতি পদে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা কবে ঘটতে পারে এবং নির্বাচন কীভাবে হবে।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদে রয়েছেন এবং তাঁর মেয়াদ চলবে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। পদে থাকা অবস্থায় সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ নেই। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য না হলে বা অভিশংসনের মাধ্যমে তাঁকে অপসারণ না করা হলে নতুন কোনো ব্যক্তি শপথ নিতে পারবেন না।
মো. সাহাবুদ্দিন পদে নিযুক্ত ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই সরকারের পতনের পরও তাঁকে পদত্যাগের জন্য জনপক্ষ থেকে দাবী উঠে। তবে বিএনপি শুরু থেকেই তার অপসারণের বিষয়ে আপত্তি জানায়। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার তাঁরই নেতৃত্বে শপথ গ্রহণ করে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাষ্ট্রপতির পদ যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সীমিত ক্ষমতার, তবে রাজনৈতিক সংকটের সময় এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকেন এবং সংসদ ভেঙে যায়, তখন রাষ্ট্রপতিই সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দিতে পারেন। এই ক্ষেত্রে আইনগতভাবে তাঁকে কাউকে পরামর্শ নিতে হয় না। তবে বাস্তবে এটি খুব বেশি প্রয়োগ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ও সংবিধান সংস্কারের আলোচনার মাধ্যমে প্রস্তুত হওয়া ‘জুলাই সনদ’-এ রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত সংস্কারে রাষ্ট্রপতি মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিজ এখতিয়ার অনুযায়ী নিয়োগ দিতে সক্ষম হবেন। সংবিধান বিশ্লেষক কাজী জাহেদ ইকবালের মতে, এ ধরনের ক্ষমতা কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে, যা সময়সাপেক্ষ।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার পদে থাকতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হতে পারে তিনভাবে মেয়াদ শেষ হওয়া, পদত্যাগ করা বা অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ। এছাড়া শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা অথবা গুরুতর অসদাচরণজনিত কারণে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে প্রতিবাদে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। তবে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেননি বা অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারিত হননি। ডিসেম্বর মাসে তিনি রয়টার্সকে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি পদ থেকে সরে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি নিজেকে ‘অপমানিত’ মনে করেছিলেন, কিন্তু সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের কারণে পদে বহাল ছিলেন।
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। প্রার্থী হতে হলে বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকেন। স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে পদ শূন্য হলে ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একজন প্রার্থী মনোনয়নের জন্য প্রয়োজন দুইজন সংসদ সদস্যের সমর্থন—একজন প্রস্তাবক ও একজন সমর্থক। একক প্রার্থী হলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয় না।
তফসিল ঘোষণার পর, সংসদ অধিবেশন চলাকালে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। যদি সেই সময়ে অধিবেশন না থাকে, তবে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তত সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করতে হয়।
১৯৯১ সালের আগে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় সরাসরি ভোটাভুটি হতো। সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসার পর এই প্রক্রিয়া বাতিল হয়। সংবিধান অনুযায়ী, এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন কেবল সংসদ সদস্যদের ভোটে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি পদে কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকতে পারে। যদি রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেন, তাহলে অভিশংসনের প্রয়োজন হবে না। যেহেতু তিনি আগেই পদত্যাগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তাই জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সংসদের প্রথম অধিবেশন এখনো শুরু হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেই অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
যদি রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়, নির্বাচন কমিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচন আয়োজন করবে। সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন নতুন রাষ্ট্রপতি। একক প্রার্থী থাকলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।
সংক্ষেপে বলা যায়, রাষ্ট্রপতির নির্বাচন এবং পদ পরিবর্তনের বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধান ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বর্তমান সরকারের কাজ শুরু হওয়ায় এই বিষয়টি আরও আলোচ্য হয়ে উঠছে।
এএন