রমজানের পবিত্র আবেশ আর পুরান ঢাকার আভিজাত্য যেখানে এক বিন্দুতে মিলেছে, সেটি হলো চকবাজার। শুক্রবার পবিত্র রমজান মাসের প্রথম দিনেই রাজধানী ঢাকার ইফতারির আদি ও অকৃত্রিম এই বাজারটি ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা রূপ।
জোহরের নামাজের পরপরই চকবাজার শাহি মসজিদের সামনের সার্কুলার রোডের দুই পাশ ভরে ওঠে ইফতারের বিচিত্র সম্ভারে। নাকে ধাক্কা দেওয়া মশলার ঘ্রাণ আর ক্রেতা, বিক্রেতাদের হাকডাকে যেন উৎসবের আমেজ লেগেছে ঐতিহাসিক এই চত্বরে।
পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা, ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ২টা। রোদ আর ভিড় উপচে পড়ছে পুরো বাজারে। সারি সারি সাজানো টেবিলের ওপর বিশাল সব ডিশে সাজানো হয়েছে গরু ও খাসির সুতি কাবাব, জালি কাবাব, চিকেন রোস্ট এবং নানা পদের শাহি ইফতারি। বিক্রেতারা ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জায়।
ক্রেতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে চকবাজারের সিগনেচার আইটেম বড় বাপের পোলায় খায়। এই পদের আলু, সুতি কাবাব, ডিম, ঘি এবং হরেক রকম মশলার মিশ্রণ বরাবরের মতোই ভোজনরসিকদের প্রথম পছন্দ।
আস্ত খাসির কাবাব: আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু, এবারের চকবাজারের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা যাচ্ছে আস্ত খাসির কাবাব। বিক্রেতা মো. সালেহ ক্রেতাদের নজর কাড়তে আস্ত একটি খাসিকে কাবাব বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন।
তিনি জানান, এর দাম হাঁকছেন ১০ হাজার টাকা। যদিও সবাই এটি কিনছেন না, কিন্তু এই বিশাল খাসির কাবাব দেখতেই মানুষের জটলা সবচেয়ে বেশি। সালেহ’র মতে, এটি বিক্রির চেয়েও প্রদর্শনী এবং ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবেই বেশি কাজ করছে।
দাম ও বাজারের হালচাল, রমজানের শুরুতেই সিন্ডিকেট আর দ্রব্যমূল্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও চকবাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সায়েন্সল্যাব এলাকা থেকে আসা ক্রেতা আবদুল হক জানান, গরুর আইটেমগুলোর দাম নাগালের মধ্যে থাকলেও মুরগি ও কোয়েল পাখির রোস্টের দাম বিক্রেতারা একটু বাড়িয়ে বলছেন।
অন্যদিকে, বিক্রেতা জাকির হোসেনের দাবি, বাজারে পণ্যের সরবারহ ভালো। তিনি জানান, মুরগির মাংসের দাম বাড়ায় চিকেন আইটেমগুলোতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি নিতে হচ্ছে, তবে অন্যান্য পদগুলো গত বছরের মতোই রাখা হয়েছে।
এক নজরে চকবাজারের ইফতারের দরদাম (২০২৬), খাসির সুতি কাবাব প্রতি কেজি ১,৬০০ টাকা, গরুর সুতি কাবাব প্রতি কেজি ১,২০৯ টাকা এবং খাসির লেগ রোস্ট প্রতি পিস ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মুরগির রোস্ট প্রতি পিস ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং কোয়েল পাখির রোস্ট প্রতি পিস ৮০ থেকে ৯০ টাকা।
আস্ত খাসির কাবাব প্রতি পিস ১০,০০০ টাকা, দুধ নান বা বাদাম নান প্রতি পিস ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং গরুর কালা ভুনা প্রতি প্যাকেট ১৫০ টাকা। এছাড়া চিকেন কাঠি বা ললিপপ প্রতি পিস ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দূর, দূরান্ত থেকে আসা ভোজনরসিকরা, পুরান ঢাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে এই বাজার এখন পুরো রাজধানীর। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মামুন হোসেন এসেছেন তাঁর দোকানের সব কর্মচারীর জন্য ইফতারি কিনতে।
তিনি বলেন, চকবাজারের ইফতারির আলাদা একটা আভিজাত্য আছে। কর্মচারীরা বায়না ধরেছে তারা প্রথম রোজায় চকের ইফতারি খাবে, তাই আসা। শুধু খাবারের গুণগত মান নয়, বরং শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য অনুভব করতেই ঢাকার গুলশান, বনানী বা উত্তরার বাসিন্দারাও ভিড় করেন এই ঘিঞ্জি গলিগুলোতে।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা, রমজানের প্রথম দিন হওয়ায় ভিড় নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে সার্কুলার রোডে যানবাহন চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, ইফতারের সময় যত ঘনিয়ে আসে, সরু রাস্তায় মানুষের চাপ সামলানো তত কঠিন হয়ে পড়ে। বিক্রেতারা প্রত্যাশা করছেন, আগামী দিনগুলোতে ক্রেতার সংখ্যা আরও বাড়বে এবং বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে।
প্রাণের স্পন্দন ফিরে পাওয়া চকবাজার, নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রথম রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেও চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী খাবারের বাজারে তার প্রভাব কিছুটা কমই দেখা গেছে।
এখানকার আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের দাম ক্রেতারা বরাবরই সানন্দে পরিশোধ করে আসছেন। মাগরিবের আজানের আগ পর্যন্ত এই ব্যস্ততা চলতেই থাকবে, আর চকবাজার প্রমাণ করবে কেন এটি এখনও বাঙালির ইফতারি সংস্কৃতির রাজধানী।
জেএইচআর