বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার এবং জলাশয় পুনরুদ্ধারে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন নবনিযুক্ত পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কালজয়ী খাল খনন কর্মসূচিকে নতুন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই দেশব্যাপী এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে।
শুক্রবার সকালে পঞ্চগড় সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসন আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে তিনি পঞ্চগড়ে পৌঁছান এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ তাঁর বক্তব্যে ১৯৭০ এর দশকের শেষভাগের স্মৃতিচারণ করে বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে দেশজুড়ে প্রায় দুই হাজার মাইলের বেশি খাল খনন করেছিলেন, যা সে সময় কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই ঐতিহ্য এবং প্রয়োজনীয়তাকে ধারণ করে আবারও দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। আমরা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই কাজ শুরু করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করছি।
তিনি আরও যোগ করেন, এই কর্মসূচি কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি হবে একটি সমন্বিত উদ্যোগ যেখানে সাধারণ মানুষ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।
দেশের নদ-নদী এবং প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্বে থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের যেসব নদী খনন করা জরুরি এবং যেসব জলাশয় অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে, সেগুলো উদ্ধারে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। খুব দ্রুতই এসব এলাকা দখলমুক্ত করে নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি জানান, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলোর একটি।
খাল খননের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে বড় ধরনের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রতিমন্ত্রী জানান, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় খননকৃত খালের দুই পাড়ে এবং নদী তীরবর্তী এলাকায় পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো হবে। তিনি বলেন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে উন্নয়ন হবে পরিবেশবান্ধব।
পঞ্চগড় সার্কিট হাউজের সভায় প্রতিমন্ত্রী জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি, স্বাস্থ্য বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যাতে সরকারের এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা বা গাফিলতি না হয়। প্রান্তিক কৃষকরা যাতে এই খনন কর্মসূচির সরাসরি সুফল পায়, সে জন্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দেশব্যাপী একযোগে খাল খনন কর্মসূচি শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মডেলে এই কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। নদী ও জলাশয় দ্রুততম সময়ে দখলমুক্ত করে নাব্যতা বৃদ্ধি করা এবং প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের অংশীদারিত্বে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া খননকৃত এলাকার চারপাশে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ অভিযানের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করার রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, উভয় দিক থেকেই প্রতিমন্ত্রীর এই ঘোষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭০ এর দশকে খাল খনন কর্মসূচি ছিল গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং সেচ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের চাবিকাঠি। বর্তমান সময়ে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং নদী ভরাট হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই পুরোনো কিন্তু কার্যকর কৌশলটি কৃষি উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে চা চাষ এবং অন্যান্য কৃষির জন্য পানির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। প্রতিমন্ত্রীর এই ঝটিকা সফর এবং ১৫ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
তারেক রহমান সরকারের অন্যতম সদস্য হিসেবে ফরহাদ হোসেন আজাদের এই ১৫ দিনের আল্টিমেটাম আমলাতন্ত্রের জড়তা ভাঙতে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন অপেক্ষায় আছে, ১৫ দিন পর সত্যিই খালের বুকে কোদাল আর শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয় কি না।
জেএইচআর