নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্ত উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে ঢাকা।
গত বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা সিডিপি চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইআরডি সচিবের চিঠিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে অভূতপূর্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের মতে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য যে পাঁচ বছর সময় পাওয়া গিয়েছিল, তা ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংকটে গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে কোভিড ১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ক্ষত, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া উন্নত দেশগুলোর কঠোর মুদ্রানীতির কারণে তৈরি হওয়া আর্থিক চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তাকেও কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। দেশীয় চ্যালেঞ্জের মধ্যে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন অন্যতম।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত থাকা বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অব্যাহত চাপ এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে মন্দা দেখা দিয়েছে।
সরকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে এই উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ কিছু শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের মতে, প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় না পেলে এই উত্তরণ টেকসই হবে না এবং এটি কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের ধারাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। গত বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পরই খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর জানান, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দিতে যা যা করা দরকার, সরকার তার সবই করবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইআরডি সমন্বিতভাবে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারও নেপাল ও লাওসের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল, যার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন করল বর্তমান নির্বাচিত সরকার।
এর আগে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তিন বছর সময় বাড়িয়ে নিয়েছে এবং মালদ্বীপ ও নেপালও বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বাড়তি সময় পেয়েছে।
জাতিসংঘের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ কার্যালয় কর্তৃক পরিচালিত গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টেও বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের প্রস্তুতি সময়কাল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। জাতিসংঘের মূলনীতি অনুযায়ী, উত্তরণ যেন কোনো দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে থমকে না দেয়, এই যুক্তিটিই এখন বাংলাদেশের প্রধান হাতিয়ার।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো ড মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, টেকসই উত্তরণের যুক্তিটি সিডিপির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল চিঠি পাঠালেই হবে না, এখন ভারত, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করতে হবে। কারণ সিডিপি সুপারিশ করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোটের মাধ্যমে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে যে সময় চাইছে, এই আবেদন তার একটি বড় অংশ। আগামী ২৪ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে সিডিপির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশের এই আবেদনটি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হতে পারে।
জেএইচআর