বাংলাদেশ রেলওয়ে, যা দেশের জনমানুষের অন্যতম প্রধান যাতায়াত মাধ্যম, সেখানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা সব সময়ই একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। সম্প্রতি রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (Chief Controller of Stores–CCS) প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন সরকারকে কেন্দ্র করে একটি '৫% কমিশন' বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই অভিযোগের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে ভিন্ন এক চিত্র। দপ্তরের ভেতরের কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশের দাবি এটি কোনো দুর্নীতি নয়, বরং দুর্নীতি দমনের চেষ্টার বিপরীতে একটি পরিকল্পিত 'চরিত্র হনন' মিশন।
অভিযোগের ব্যবচ্ছেদ: কতটুকু সত্য, কতটুকু গুজব?
সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, টেন্ডার অনুমোদন এবং বিল ছাড় করার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে কমিশন আদায়ের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই অভিযোগের তির সরাসরি প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন সরকারের দিকে। কিন্তু বাস্তবতা যাচাইয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।
বর্তমানে সরকারি ক্রয়ের সিংহভাগ সম্পন্ন হয় ই-জিপি (e-GP) বা ডিজিটাল টেন্ডারিং পদ্ধতির মাধ্যমে। রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সংশ্লিষ্টদের মতে, যেখানে পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন হয় এবং একাধিক স্তরে যাচাই-বাছাই করা হয়, সেখানে একক কোনো কর্মকর্তার পক্ষে ৫% বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট অংকের কমিশন আদায় করা গাণিতিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রায় অসম্ভব।
রেলওয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখনকার সিস্টেমে স্বচ্ছতা অনেক বেশি। ক্রয় প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিল পেমেন্ট পর্যন্ত সব কিছু সফটওয়্যারে রেকর্ড থাকে। ফলে কারো ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আর্থিক লেনদেনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এই ধরনের অভিযোগ মূলত বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি হাতিয়ার মাত্র।
শুদ্ধি অভিযানের মাসুল?
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রকৌশলী বেলাল হোসেন সরকার রেলের সরঞ্জাম ক্রয় ও বিল পরিশোধ প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু কঠোর সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন। সূত্র জানায়, আগে নথিপত্র যাচাইয়ে যে শিথিলতা ছিল, তিনি তা কঠোরভাবে বন্ধ করেছেন। বিশেষ করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করা এবং নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ রুখতে তার অনমনীয় অবস্থান অনেক পুরনো "অসাধু সিন্ডিকেট এর পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যখনই কোনো প্রতিষ্ঠানে চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়, তখনই দীর্ঘদিনের সুবিধাভোগী মহলটি অস্থির হয়ে ওঠে। প্রকৌশলী বেলালের বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার সেই অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও দাপ্তরিক পরিবেশ
দপ্তরের সহকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বেলাল হোসেন সরকার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিয়ম-শৃঙ্খলার ব্যাপারে আপসহীন। তার অধীনে থাকা একজন কর্মকর্তা জানান, স্যার আসার পর থেকে বিল প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বেড়েছে। আমরা এখন অনেক বেশি দায়বদ্ধতার সাথে কাজ করছি। যারা আগে নিয়ম না মেনে কাজ হাসিল করতে চাইত, তারা এখন আর সুবিধা করতে পারছে না বলেই এই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
সহকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই অভিযোগের মাধ্যমে একজন সৎ কর্মকর্তার মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে রেলের সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে যায়।
প্রকৌশলী বেলাল হোসেন সরকারের আত্মপক্ষ সমর্থন
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে অত্যন্ত ধীরস্থির কণ্ঠে মো. বেলাল হোসেন সরকার বলেন, আমি সরকারি বিধি-বিধান এবং আর্থিক নীতিমালা মেনেই আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন করে আসছি। ৫% কমিশনের যে কথা ছড়ানো হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, নিরপেক্ষ কোনো তদন্ত হলে আমার সততা এবং স্বচ্ছতা প্রমাণিত হবে।
তিনি আরও যোগ করেন যে, কোনো গোষ্ঠী যদি মনে করে অপপ্রচার চালিয়ে তাকে নিয়মের পথ থেকে বিচ্যুত করবে, তবে তারা ভুল করছে। রেলওয়ের সম্পদ রক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিনি ভবিষ্যতেও কঠোর অবস্থানে থাকবেন।
স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান ও আগামীর প্রত্যাশা
যেকোনো অভিযোগই গুরুত্বের সাথে নেওয়া উচিত, তবে সেটি যদি হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তবে তার বিচার হওয়াও জরুরি। রেলওয়ের সচেতন মহল মনে করছে, একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা দরকার। এতে দুটি বিষয় নিশ্চিত হবে:
সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার পথে বাধা আসা নতুন কিছু নয়। প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি প্রশাসনিক সংস্কারের বিরুদ্ধে আক্রমণ কিনা তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। রেলওয়ের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যেন কোনো সৎ কর্মকর্তা ষড়যন্ত্রের শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের দায়িত্ব।
জেএইচআর