ঢাকা থেকে ফ্লাইট বাতিলের সেঞ্চুরি ছাড়াল, চরম সংকটে হাজারো যাত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ০১:২০ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ যত বাড়ছে, বাংলাদেশের আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা ততই স্থবির হয়ে পড়ছে। ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক বিধ্বংসী সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক আকাশপথ (এয়ারস্পেস) অনিরাপদ হয়ে ওঠায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন কার্যত এক অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে। 

বুধবার নতুন করে আরও ২৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়ে গত মাত্র পাঁচ দিনে ঢাকা থেকে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা ১৭৩-এ গিয়ে ঠেকেছে, যা দেশের এভিয়েশন ইতিহাসে এক নজিরবিহীন বিপর্যয়।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আজ বুধবারের বাতিল হওয়া ২৫টি ফ্লাইটের মধ্যে বিশ্বের নামী-দামী সব এয়ারলাইন্স রয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশপথ ব্যবহার করা এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। 

আজ বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে এয়ার অ্যারাবিয়ার, তাদের ৮টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া এমিরেটস এয়ারলাইনসের ৫টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৪টি এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েত এয়ারওয়েজ ও জাজিরা এয়ারওয়েজের ২টি করে ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই ঢাকার বিমানবন্দরে বাতিলের হিড়িক পড়ে। গত পাঁচ দিনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পরিস্থিতি দিন দিন কতটা জটিল হচ্ছে। 

গত কয়েক দিনে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়। এরপর ১ মার্চ বাতিল হয় ৪০টি ফ্লাইট। ২ মার্চ সর্বোচ্চ ৪৬টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। ৩ মার্চ বাতিলের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩৯টিতে। আর ৪ মার্চ (আজ) পর্যন্ত ২৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

মোট ১৭৩টি ফ্লাইটের যাত্রা বাতিলের ফলে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, যাদের বড় একটি অংশই প্রবাসী শ্রমিক।

জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস’ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তাদের ৫ মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রায় সব ফ্লাইট স্থগিত ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ; সৌদি আরবের দাম্মাম, কাতারের দোহা এবং কুয়েতগামী ফ্লাইটগুলো। বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্রু এবং যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সাময়িক বিরতি নেওয়া হয়েছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরেজমিনে দেখা গেছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। অনেক প্রবাসী শ্রমিক গ্রাম থেকে ধার-দেনা করে টিকিট কেটে বিমানবন্দরে এসে শুনছেন ফ্লাইট বাতিল। বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতারগামী যাত্রীদের সংখ্যা বেশি। অনেকেরই ভিসার মেয়াদ শেষ পর্যায়ে, ফলে ফ্লাইট বাতিলের খবরে তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

যাত্রীদের অভিযোগ, ফ্লাইট বাতিলের খবর অনেক সময় আগে থেকে জানানো হচ্ছে না। অন্যদিকে, এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আকাশপথ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং রুট পরিবর্তনের জটিলতায় তারা অসহায়।

বেবিচক এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ইরান ও তার আশপাশের আকাশপথ এড়িয়ে চলতে হলে এখন ফ্লাইটগুলোকে অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে ফ্লাইটের সময় যেমন বাড়ছে, তেমনি জ্বালানি খরচও কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক এয়ারলাইন্স লভ্যাংশ ঠিক রাখতে এই বাড়তি খরচে ফ্লাইট পরিচালনা না করে বাতিল করাকেই শ্রেয় মনে করছে।

মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের মূল উৎস। হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মস্থলে ফেরা বিলম্বিত হওয়া মানেই দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়া। যদি এই যুদ্ধাবস্থা আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত ও জনশক্তি রপ্তানি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরে আসার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের কল সেন্টার বা ওয়েবসাইট থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিতে হবে।

বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীরা চাইলে পূর্ণ রিফান্ড অথবা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিনামূল্যে নতুন টিকিট বা রিশিডিউলিং সুবিধা পাবেন। যুদ্ধাবস্থার কারণে আকাশপথের নিরাপত্তা প্রটোকল প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই যে কোনো সময় নতুন ঘোষণা আসতে পারে।

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ কেবল একটি অঞ্চলের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে হাজার মাইল দূরের ঢাকাতেও। আকাশপথের এই অচলাবস্থা কেবল যাতায়াত বিড়ম্বনা নয়, এটি একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের রূপ নিচ্ছে। বিশ্বনেতারা যদি দ্রুত এই সংঘাত থামাতে না পারেন, তবে আকাশপথের এই ‘সেঞ্চুরি করা’ ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা আগামী কয়েক দিনে আরও বাড়বে এমনটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এএন