রাজনৈতিক হয়রানির বিচারিক অবসান: মামলা প্রত্যাহারে উচ্চপর্যায়ের সরকারি কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ১০, ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হয়রানিমূলক মামলার জট খোলার লক্ষ্যে সরকার একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং তা আইনি প্রক্রিয়ায় প্রত্যাহারের জন্য একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গত ৮ মার্চ (রোববার) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কমিটি ও অর্থনৈতিক) মো. হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই কমিটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়।

নতুন গঠিত এই কমিটির নেতৃত্বে থাকছেন সরকারের অন্যতম নীতিনির্ধারক ও আইন বিশেষজ্ঞ। জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কমিটির কাঠামোতে আহ্বায়ক আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুজ্জামান। সদস্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (সিনিয়র সচিবও অন্তর্ভুক্ত), আইন ও বিচার বিভাগের একজন প্রতিনিধি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত বা যুগ্মসচিব (আইন অনুবিভাগ)। সদস্য সচিব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন-১ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

সরকার মনে করছে, এই কমিটির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিতর্কিত মামলাগুলোর দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীরা আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি পাবেন।

এই কমিটি কেবল সরাসরি মামলা প্রত্যাহার করবে না, বরং একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক স্তরের মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাই করবে। প্রজ্ঞাপনে কমিটির কাজের তিনটি প্রধান দিক উল্লেখ করা হয়েছে। 

১. সুপারিশ যাচাই: জেলা পর্যায় থেকে যে সকল রাজনৈতিক মামলার তালিকা এবং প্রত্যাহারের সুপারিশ আসবে, কেন্দ্রীয় এই কমিটি সেগুলো গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে।

২. তালিকা প্রণয়ন: যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃতপক্ষেই যেগুলো হয়রানিমূলক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, সেই মামলাগুলো চিহ্নিত করে একটি চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হবে।

৩. সচিবালয় সহায়তা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই কমিটিকে প্রয়োজনীয় সাচিবিক ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কমিটি নতুন কোনো বিশেষজ্ঞ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত (কো-অপট) করতে পারবে।

বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় 'রাজনৈতিক মামলা' একটি দীর্ঘকালীন জটিল সমস্যা। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে আদালতের ওপর যেমন চাপ বাড়ে, তেমনি নাগরিক অধিকারও লঙ্ঘিত হয়।

২০২৬ সালের এই বিশেষ উদ্যোগটি মূলত বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং আইনের শাসন সুসংহত করার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে যারা রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দী বা মামলার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাদের জন্য ন্যায়বিচারের একটি নতুন জানালা খুলে গেল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কমিটি গঠনের ফলে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন অর্থাৎ জেলা কমিটির কাজ আরও গতিশীল হবে। কারণ জেলা পর্যায় থেকে পাঠানো সুপারিশগুলো এখন সরাসরি কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারকদের অধীনে পর্যালোচিত হবে। তবে এর স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং কোনো অপরাধী যেন এই সুযোগে পার না পেয়ে যায়, সেদিকেও নজর দেওয়ার চ্যালেঞ্জ থাকবে কমিটির সামনে।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন জেলার মামলার তালিকা পর্যালোচনা শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুস্থ ধারার বিচারিক পরিবেশ তৈরিতে এই কমিটি গঠনকে সময়ের দাবি হিসেবে দেখছেন সচেতন সমাজ। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি কত দ্রুত ভুক্তভোগীদের মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

এএন