জ্বালানি হাহাকার

পাম্পে দীর্ঘ সারি, খোলা বাজারে চড়া দামে মিলছে তেল

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম

সরকারের নানামুখী আশ্বাস এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার নানাবিধ উদ্যোগের পরেও কাটছে না জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে অলিগলি, সবখানেই এখন তেলের জন্য হাহাকার। 

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব অস্থিরতা। পাম্পের বাইরে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি সড়ক ছাপিয়ে মূল রাস্তায় গিয়ে ঠেকেছে, অথচ অধিকাংশ চালকই ফিরছেন শূন্য হাতে।

বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাংলামটর, তেজগাঁও এবং মিরপুর এলাকার বেশ কিছু পেট্রোল পাম্প সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ পাম্পের প্রবেশপথে 'তেল নেই' লেখা বোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কোথাও আবার রশি টেনে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে প্রবেশপথ। 

যেসব পাম্পে সামান্য পরিমাণ মজুত আছে, সেখানেও রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। একেকটি মোটরসাইকেল বা প্রাইভেটকারের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করেও চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, নির্ধারিত সরকারি মূল্যে পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল না পাওয়া গেলেও রাজধানীর মোড়ে মোড়ে বোতলজাত অবস্থায় খোলা বাজারে মিলছে তেল। তবে তার দাম লিটারপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি। সাধারণ চালকদের অভিযোগ, একশ্রেণির অসাধু চক্র পাম্প থেকে যোগসাজশ করে তেল সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করছে।

মোটরসাইকেল চালক রাজিব হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিন ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে পাম্পের কাছে আসতেই বলা হলো তেল শেষ। অথচ পাম্পের পেছনেই একটি দোকানে বোতলে করে সেই একই তেল অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তদারকি করার কি কেউ নেই?

সংকট সামাল দিতে এবং তেলের অপব্যবহার রোধে সরকার সম্প্রতি 'ফুয়েল কার্ড' বা বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। আজ অনেক পাম্পেই দেখা গেছে, সঠিক কাগজপত্র না থাকায় অনেক চালককে তেল না দিয়েই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ রাইড শেয়ারিং চালক এবং জরুরি কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেক চালক দাবি করেছেন, এই নিয়ম কেবল সাধারণ মানুষের জন্যই কঠোর, প্রভাবশালী বা সিন্ডিকেটের জন্য নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি পর্যায়ে ডলার সংকটের কারণে এলসি (LC) খোলায় দেরি হওয়ার প্রভাব এখন সরাসরি খুচরা বাজারে পড়ছে। সরকার সরবরাহ স্বাভাবিক আছে দাবি করলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। ডিলার এবং পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে তারা চাইলেও সবাইকে তেল দিতে পারছেন না।

জ্বালানি তেলের এই অঘোষিত সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ পরিবহনেও। তেলের অভাবে অনেক পাবলিক বাস এবং ট্রাক চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে করে অফিসগামী যাত্রী এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহনে খরচ বাড়ছে। সব মিলিয়ে বাজার ব্যবস্থায় একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মজুদ পর্যাপ্ত রয়েছে এবং ভয়ের কোনো কারণ নেই। তবে মাঠ পর্যায়ে কেন এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হলো, তা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ঝটিকা অভিযানের কথা বলা হলেও খোলা বাজারে চড়া দামে তেল বিক্রি বন্ধে তা এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

আজকের সরেজমিন চিত্র বলছে, সাধারণ মানুষ তেলের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে। তেলের পাম্পের এই দীর্ঘ সারি কেবল যানের সারি নয়, এটি সাধারণ মানুষের চরম ধৈর্য আর অনিশ্চয়তারও প্রতীক। যদি দ্রুত এই সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা না হয় এবং খোলা বাজারের কালোবাজারি বন্ধ না হয়, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এএন