বিশ্বরাজনীতির টানাপোড়েন আর মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ ছাপিয়ে শান্তির ললিত বাণী শোনা যাচ্ছে, ঠিক তখনই তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজারে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করছে। এক দিনের ব্যবধানে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির দামে বড় ধরনের পতন ঘটলেও, অনিশ্চয়তা কাটেনি পুরোপুরি। ফলে আজ বৃহস্পতিবার পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে তেলের বাজার।
গত বুধবার যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে তিন দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক খবর ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ‘১৫.৯%‘কমে ‘৯২ ডলারে‘নেমে আসে। বাজারের এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল মূলত সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশার প্রতিফলন। তবে বৃহস্পতিবার সকাল হতেই সেই চিত্র আবার বদলে যেতে শুরু করে।
শীর্ষস্থানীয় ওয়েবসাইট ‘অয়েলপ্রাইস ডটকম‘এর তথ্যমতে, আজ বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫ ডলারের বেশি বেড়ে ‘৯৭ ডলারে‘গিয়ে ঠেকেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে কি না—এমন শঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় বাজারে এই অস্থিরতা বিরাজ করছে।
মার্কিন রাজনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব সাম্প্রতিক জ্বালানি দরের পরিবর্তনে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বুধবার $৯২ প্রতি ব্যারেল থেকে বৃহস্পতিবার $৯৭ প্রতি ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধবিরতির খবরের পরও বাজারে অস্থিরতার প্রভাব প্রতিফলিত করে। এ সময়ের তুলনায় যুদ্ধের আগের গড় দর ছিল মাত্র $৭০, যা বর্তমান পরিস্থিতির তীব্রতা ও বাজারে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, এলএনজি-এর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে; বুধবার প্রতি ইউনিট $১৬.৩৪-এর স্থানে বর্তমানে $১০-এর নিচে নেমে এসেছে। এই ওঠাপড়ার মধ্যে মার্কিন রাজনীতির নীতি-নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ চেইনের ব্যাঘাতগুলো জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করছে। ফলে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠা-পড়া এবং স্থানীয় স্তরে জ্বালানির সাশ্রয়ী নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আলফাসেন্স‘এর বিশ্লেষক জ্যাভিয়ার স্মিথ বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জ্বালানি তেলের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। তিনি একে ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারা‘ র সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কোনোভাবেই চায় না যে তেলের দাম ১১৯ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাক, কারণ এটি মার্কিন অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে সরবরাহের যে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছিল, তা অন্তত প্রশমিত হবে।
ইরান ও ইসরায়েলের এই সংঘাতের আঁচ সবচেয়ে বেশি লেগেছে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে। জাপানের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিকসের গবেষক ইচিরো কুতানির মতে, এশিয়ার দেশগুলো পারস্য উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় এই সংকট তাদের জন্য অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফিলিপাইন: জ্বালানি আমদানির ৯৮ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসায় দেশটি গত ২৪ মার্চ জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। সেখানে পেট্রলের দাম রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
বিমান সেবা: জেট ফুয়েলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় এশিয়ার অনেক বিমান সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে অথবা টিকিটের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মজুত সংকট: অধিকাংশ উন্নয়নশীল এশীয় দেশের পর্যাপ্ত তেল মজুত রাখার সক্ষমতা না থাকায় তারা বিশ্ববাজারের এই তাৎক্ষণিক অভিঘাতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধবিরতির খবর শুধু সংবাদ নয়, বরং এটি একটি বড় অর্থনৈতিক স্বস্তি। পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা বাংলাদেশের জ্বালানি ও এলএনজিবাহী জাহাজগুলো এখন পুনরায় যাত্রা শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, যুদ্ধের কারণে দেশে অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রীয় পরিশোধনাগারগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। দ্বিগুণেরও বেশি দামে পরিশোধিত তেল কিনতে গিয়ে দেশের কোষাগারে বড় চাপ তৈরি হচ্ছিল।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত‘ জানান, আটকে থাকা ‘১ লাখ টন‘অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ এখন বাংলাদেশের পথে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি দেশে পৌঁছালে উৎপাদন ব্যবস্থা পুনরায় সচল হবে এবং ডলারের ওপর চাপ কমবে।
বাংলাদেশ মূলত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করে। যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ‘মো. এরফানুল হক‘জানিয়েছেন, এলএনজিবাহী ট্যাংকার ‘লিব্রেথা’এখন রওনা হওয়ার সবুজ সংকেত পাচ্ছে।
বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম ২০ ডলার থেকে কমে ‘১৬.৩৪ ডলারে‘নেমে আসায় মে মাসের জন্য খোলাবাজার (Spot Market) থেকে কম দামে গ্যাস কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হলে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকেও তেলের জাহাজ আসার কথা রয়েছে। গত মাসে ডিজেলের যে ছয়টি জাহাজ শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে আসতে পারেনি, সেগুলো এ মাসেই বন্দরে ভেড়ানোর চেষ্টা চলছে।
তবে মূল চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে ‘হরমুজ প্রণালি‘নিয়ে। যদি এই নৌপথটি নিরাপদ না হয়, তবে সরবরাহ খরচ এবং সময় উভয়ই বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এসেছে। পরিস্থিতি যুদ্ধের আগের অবস্থায় (৭০ ডলার প্রতি ব্যারেল) ফিরে যেতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবুও, এশিয়াসহ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই বিরতিটুকু নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। জ্বালানি অবকাঠামো মেরামত এবং সরবরাহের চেইন পুনরায় সচল হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরবে এমনটাই এখন প্রত্যাশা।
এএন