ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি মেধাবীর স্বপ্নভঙ্গ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
ছবি : লিমন ও বৃষ্টি

উচ্চশিক্ষার রঙিন স্বপ্ন আর এক বুক আশা নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই প্রাক্তন শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। লক্ষ্য ছিল পিএইচডি শেষ করে দেশের মাটিতে শিক্ষকতা ও গবেষণায় অবদান রাখা। 

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার তপ্ত রোদ আর নীল আকাশ সাক্ষী হয়ে রইল এক বীভৎস ট্র্যাজেডির। ঘাতকের নির্মম আঘাতে কেবল দুটি প্রাণই ঝরে যায়নি, পিষ্ট হয়েছে দুটি পরিবারের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এবং একটি সম্ভাব্য সুন্দর ভবিষ্যৎ।

গত ১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা (ইউএসএফ) ক্যাম্পাস থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন লিমন ও বৃষ্টি। লিমন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে এবং বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করছিলেন। ১৬ এপ্রিল শেষবার তাঁদের ক্যাম্পাসে দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকেই তাঁদের মোবাইল ফোন বন্ধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কোনো উপস্থিতি ছিল না।

এক সপ্তাহ ধরে উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কার পর গত শুক্রবার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে আসে সেই হাড়হিম করা খবর। ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ। এর পরপরই বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত ফেসবুকের এক পোস্টে নিশ্চিত করেন, তাঁর বোন আর নেই। যদিও বৃষ্টির মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তবে মার্কিন পুলিশ তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম সালেহ আবুঘরবেহকে। হিশাম লিমনের রুমমেট ছিলেন। গ্রেপ্তারের সময়কার দৃশ্য ছিল কোনো থ্রিলার সিনেমার মতো। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টারের নেতৃত্বে সোয়াট (SWAT) টিম এবং সংকটকালীন আলোচক দল দীর্ঘ সময় ঘাতকের বাড়িটি ঘিরে রাখে। অবশেষে সেই বাড়ি থেকে কেবল একটি তোয়ালে পরিহিত অবস্থায় হাত উঁচিয়ে আত্মসমর্পণ করে হিশাম।

তদন্তে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর তথ্য। হিশাম আবুঘরবেহর অপরাধের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০২৩ সালে শারীরিক আঘাত ও সহিংসতার অভিযোগে তাকে দুইবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এমনকি তার নিজের ভাই তার বিরুদ্ধে আদালতে নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) চেয়েছিলেন। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার ফাঁকফোকর দিয়ে গত মে মাসে সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ জানান, লিমন তার এই রুমমেটকে নিয়ে মাঝেমধ্যে অস্বস্তির কথা বলতেন, কিন্তু তা যে এমন প্রাণঘাতী রূপ নেবে, তা ছিল কল্পনার অতীত।

লিমন ও বৃষ্টির সম্পর্ক ছিল কেবল সহপাঠীর নয়, বরং তা ছিল গভীর এক আত্মিক বন্ধন। তাঁরা একে অপরকে ভালোবাসতেন এবং অচিরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসার পরিকল্পনা করছিলেন। লিমনের ভাই জুবায়েরের স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেই আবেগঘন তথ্য- ‘লিমন বলত, বৃষ্টি খুব গুণী মেয়ে। সে চমৎকার গান গাইতে পারে, আবার রান্নাতেও পটু।

পিএইচডির ব্যস্ততার মাঝেও তাঁরা নিজেদের জন্য একটি ছোট পৃথিবী গড়ে তুলেছিলেন। লিমনের লক্ষ্য ছিল ডিগ্রি শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়া। সেই স্বপ্ন এখন কেবলই নীল বেদনার কাব্য। ১৬ এপ্রিল সকালে লিমনের ছাত্রাবাস এবং বৃষ্টির ল্যাবরেটরি থেকে বের হওয়ার সেই মুহূর্তটিই ছিল তাঁদের শেষ স্বাভাবিক বিচরণ।

বৃষ্টির শিক্ষা জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি)। তিনি ছিলেন ১৩তম ব্যাচের অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। তাঁর মৃত্যুর খবর ক্যাম্পাসে পৌঁছামাত্রই শোকের স্তব্ধতা নেমে আসে। বৃষ্টির সহপাঠী ফারজানা হক ফেসবুকে লিখেছেন, বৃষ্টি, মানুষ কি এভাবেও হারিয়ে যেতে পারে? তুই ছাড়া সারা জীবন এসব স্মৃতি কীভাবে বয়ে বেড়াব?

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফাতেহা নূর রুবেল তাঁর প্রিয় ছাত্রীর কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, বৃষ্টি ছিল নম্র, ভদ্র ও অত্যন্ত মেধাবী। শ্রেণিকক্ষে তার মনোযোগ আমাদের মুগ্ধ করত। এমন একজন সম্ভাবনাময় গবেষকের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া অসম্ভব।
‘আইনি জটিলতা ও বিচারহীনতার প্রশ্ন‘

এই হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অভিযুক্ত হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে আগে থেকেই উগ্র আচরণ ও হামলার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে কেন একজন বিদেশি শিক্ষার্থীর সাথে থাকার অনুমতি দেওয়া হলো, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। হিশামের বিরুদ্ধে বর্তমানে হত্যা, প্রমাণ লোপাট এবং মৃতদেহ অবৈধভাবে সরানোর মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ বিভাগ জানিয়েছে, হিশাম শুরুতে তদন্তে সহযোগিতা করলেও পরে চুপ হয়ে যায়। তবে ফরেনসিক রিপোর্ট এবং বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, হত্যাকাণ্ডটি হিশাম একাই ঘটিয়েছে।

কেন এই মেধাবী দুই শিক্ষার্থীকে অকালে প্রাণ দিতে হলো? লিমন ও বৃষ্টির অপরাধ কী ছিল? বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত মিরপুরের বাসায় বসে এখনো বোনকে ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশা আঁকড়ে ধরে আছেন। তিনি বলেন, পুলিশ বলেছে আমার বোন নেই, কিন্তু আমরা এখনো তার দেহটি দেখতে পাইনি। আমরা চাই বিচার হোক, যেন আর কোনো মেধাবীর স্বপ্ন এভাবে বিদেশি মাটিতে পিষ্ট না হয়।

‘লিমন ও বৃষ্টি ছিলেন বাংলাদেশের গর্ব। তাঁরা গিয়েছিলেন বিশ্বকে জয় করতে, বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে। অথচ তাঁদের ফিরে আসতে হচ্ছে কফিনে চড়ে। এই ঘটনা কেবল যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজারো শিক্ষার্থীর মনে ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। ঘাতক হিশামের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই হতে পারে নিহতদের বিদেহী আত্মার জন্য সামান্যতম সান্ত্বনা।

আকাশের সেই বৃষ্টি আর মাটির লিমনের স্বপ্নগুলো এখন ফ্লোরিডার হাওয়ায় মিশে আছে, যা আজীবন আমাদের মনে করিয়ে দেবে এক অসমাপ্ত প্রেম আর অকালে ঝরে যাওয়া দুই নক্ষত্রের কথা।

এএন