ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষটি আজ কেবল আইন প্রণয়নের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অমীমাংসিত বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন যে বক্তব্য প্রদান করেছেন, তা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর দিকনির্দেশনা এবং কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার বক্তব্যে একদিকে ফুটে উঠেছে ‘জুলাই বিপ্লবের’ চেতনা রক্ষা করার অঙ্গীকার, অন্যদিকে এসেছে একাত্তরের অমীমাংসিত ইতিহাসের প্রতি আপসহীন অবস্থান।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্যের মূল সুর ছিল ২০২৪ সালের জুলাই মাসের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলো। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, আওয়ামী লীগ যতক্ষণ না পর্যন্ত জুলাইয়ের গণহত্যার রক্তের দাগ নিজেদের গা থেকে মুছে ফেলতে পারছে, ততক্ষণ এই রাজনৈতিক বিতর্কের কোনো মীমাংসা হবে না।
তিনি বলেন, যদি পরাজিত আওয়ামী লীগ আবার কোনোদিন এই সংসদে ফিরে আসার দুঃস্বপ্ন দেখে এবং দাবি করে যে ২৪-এর জুলাই গণহত্যার কথা বলা যাবে না, তবে তাদের মনে রাখা উচিত—রক্তের দাগ এত সহজে মোছে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যারা দম্ভ করে, তাদের পরিণতি কখনো সুখকর হয় না।
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান সরকার জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে একটি নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করছে। জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হওয়া হবে এক ধরনের জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা- এটাই ছিল তার ভাষণের অন্তর্নিহিত বার্তা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে ইতিহাসের এক ‘ব্যতিক্রমী’ সংসদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জহির উদ্দিন স্বপন। বিগত ১২টি সংসদের সঙ্গে এই সংসদের মৌলিক পার্থক্য হলো এর গঠনগত বৈচিত্র্য। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি যে দ্বিদলীয় কাঠামোয় (বিএনপি-আওয়ামী লীগ) বন্দী ছিল, এবারের নির্বাচনের পরিসংখ্যান সেই প্রথাগত ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
বিশেষ করে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের উত্থান নিয়ে মন্ত্রী গভীর বিশ্লেষণাত্মক মন্তব্য করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, জামায়াতে ইসলামী অতীতে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে কখনও ৫ শতাংশ ভোটের বেশি পায়নি। কিন্তু এবারের ‘জাদুকরি’ পরিসংখ্যান এবং ভোটারদের আচরণের পরিবর্তন নিয়ে তিনি গভীর গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, পালিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের সমর্থক ভোটাররা এবার কোথায় ভোট দিয়েছেন? ভোটের এই পরিসংখ্যানগত উল্লম্ফন কি কেবলই রাজনৈতিক সমর্থন, নাকি এর পেছনে কোনো সুপ্ত সমীকরণ কাজ করেছে?
জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা এবং বর্তমান সময়েও শরীয়াহ আইন কায়েমের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যে দ্বৈততা রয়েছে, তা যতক্ষণ না পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থানে পৌঁছাচ্ছে, ততক্ষণ জামায়াতের সঙ্গে বিতর্কের অবসান হবে না।
রাজনীতির আলোচনার সমান্তরালে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির চিত্রটিও মন্ত্রী অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল একটি দেউলিয়া প্রায় অর্থনীতি।
অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ:
বিশাল ঋণের বোঝা: গত সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে বর্তমান সরকার।
বাজেট পরিকল্পনা: অর্থমন্ত্রী আগামী এক মাসের মধ্যে ৮ লাখ কোটি টাকার একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু বাস্তবসম্মত বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন।
জ্বালানি সংকট: বিদ্যুৎমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করছেন।
তবে হতাশার মধ্যেও আশার বাণী শুনিয়েছেন জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান যে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারের দৈনিক টার্নওভার ৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে এসেছে অভাবনীয় গতি। এটি প্রমাণ করে যে, বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীদের মধ্যে স্থিতিশীলতার আস্থা ফিরে এসেছে।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি ইঙ্গিত করে জহির উদ্দিন স্বপন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, কারাগারে থাকার সময় তিনি বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতার সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিরোধীদলীয় নেতা কোনো প্রচলিত ছাত্রসংগঠনের (যেমন ছাত্রসংঘ) গণ্ডি থেকে উঠে আসেননি, বরং তিনি নিজস্ব চিন্তাধারা থেকে জামায়াতকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এই ব্যক্তিগত সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি তিনি ১১-দলীয় জোটকে একটি গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটিতে আপনারা যেমন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন, রাজপথ এবং সংসদের অন্যান্য আচরণেও সেই একই গঠনমূলক মানসিকতা বজায় রাখুন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যখন কোনো দল ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে বা স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে ব্যবসা করতে চায়, তখন তাদের আচরণে অসংলগ্নতা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। বিএনপি এই ধরনের অপরাজনীতিকে প্রশ্রয় দেবে না এবং সংবিধানের ভেতর থেকেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে।
জহির উদ্দিন স্বপনের এই দীর্ঘ ও তথ্যবহুল ভাষণ কেবল একজন মন্ত্রীর বক্তব্য ছিল না, এটি ছিল একটি নবগঠিত সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহারের প্রতিফলন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বিএনপি সরকার একদিকে যেমন জুলাই বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করবে, অন্যদিকে একাত্তরের চেতনার প্রশ্নেও কোনো ছাড় দেবে না।
সংসদের এই ‘বৈচিত্র্য’কে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারা যাতে কোনোভাবেই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের পাহাড় মাথায় নিয়েও যে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, সেই অগ্রযাত্রায় তিনি সকল দলের অংশগ্রহণ কামনা করেন।
সবশেষে, তথ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করল—যেখানে ইতিহাস, ধর্ম, গণতন্ত্র এবং অর্থনীতির সূচকগুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখন দেখার বিষয়, বিরোধী দল এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে কতটুকু গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে এবং সরকার তার ঘোষিত লক্ষে কতটুকু অবিচল থাকতে পারে।
একাত্তরের অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং চব্বিশের জুলাইয়ের রক্তের দাবি—এই দুই স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই আবর্তিত হবে বাংলাদেশের আগামীর সংসদীয় রাজনীতি।
এএন