জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হাসপাতালে গিয়ে ‘গুলি করা হয়েছে মরেনি, ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলুন’ বলে চিকিৎসকদের শাসিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেওয়ার সময় এক ভুক্তভোগী সাক্ষী এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান।
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি ষষ্ঠ সাক্ষী। নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
পেশায় মেরাদিয়া এলাকার একটি বাড়ির দারোয়ান ওই সাক্ষী জবানবন্দিতে জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে তিনি রামপুরা থানার পাশে মেরাদিয়া কাঁচাবাজারে ছাত্র আন্দোলন দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছামাত্রই বিজিবি, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাতে দেখেন। এতে বেশ কয়েকজন ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং বহু আন্দোলনকারী রক্তাক্ত ও আহত হন।
তিনি বলেন, ‘ভয় পেয়ে যখন আমি বাসার দিকে রওনা হই, তখন পেছন থেকে একটি গুলি এসে আমার কোমরের নিচে লেগে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়।’ জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি নিজের প্যান্ট খুলে ট্রাইব্যুনালে গুলির ক্ষতস্থানটি দেখান।
সাক্ষী আরও জানান, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও পরদিন ২০ জুলাই রাতে তাঁকে জোরপূর্বক হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ওই রাতে আওয়ামী লীগের লোকজন হাসপাতালে এসে চিকিৎসকদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন-‘এদের গুলি করা হয়েছে মরেনি, এদের ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলুন’। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে কোনো চিকিৎসাপত্র বা কাগজপত্র না দিয়েই তাড়িয়ে দেয়।
বাসায় ফেরার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন এই সাক্ষী। পরবর্তীতে একজন নির্দলীয় প্রতিবেশীর সহায়তায় তিনি ফরাজি হাসপাতালে নিজস্ব খরচে চিকিৎসা নেন।
নিজের এই অবস্থার জন্য বিজিবির রেদোয়ান, রাফাত, পুলিশের রাশেদ এবং ওসি মশিউরকে দায়ী করেন ওই ব্যক্তি। বর্তমানে শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে অসহায় দিন কাটাচ্ছেন জানিয়ে ট্রাইব্যুনালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি।
রামপুরার এই হত্যা মামলায় মোট আসামি চারজন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে বন্দি রয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত বিন আলম। অন্যদিকে ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান এখনো পলাতক রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম ও মার্জিনা রায়হানসহ অন্যান্যরা।
জেএইচআর